আব্দুল হাকিমের কন্সটেবল থেকে বিসিএস পুলিশ হবার গল্প

২০১৩ সালে কনস্টেবল হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন আব্দুল হাকিম। চাকরিরত অবস্থাই স্বপ্নপাখি ডানা মেলে- বিসিএস ক্যাডার হবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের তীব্র ইচ্ছায় কঠোর সংগ্রাম করতে থাকেন নিয়মিত। শেষমেশ স্বপ্ন এসে ধরা দেয় তার হাতে। কনস্টেবল থেকে এখন তিনি পুলিশ পুলিশি ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হতে যাচ্ছেন।

বুধবার ৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে পুলিশ ক্যাডারে (এএসপি) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন আব্দুল হাকিম। সেখানে পুলিশ ক্যাডারে মেধাতালিকায় ৬৭তম স্থান অর্জন করেন তিনি।

হাকিম নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়দাবাদ গ্রামের সিরাজ মিয়ার পঞ্চম সন্তান। বাবা ছিলেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা। ২০১০ সালে হাকিমের এসএসসি পরীক্ষার কয়েকদিন আগে তার বাবা মারা যান। শোক আর কষ্ট নিয়ে কোনোরকম পরীক্ষার সিটে বসতে হয়েছিল হাকিমকে। ফলও তেমন ভালো হয়নি।

এরপর টানাটানির সংসারে পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ ছিল না। বাবার মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা, তিনজনের প্রাপ্য রেশন আর বড় ভাইয়ের সামান্য আয়ে কোনো রকমে চলছিল পাঁচ ভাই-বোন আর মাকে নিয়ে বিশাল সংসার। এই অবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন হাকিম। চেষ্টা করেন সংসারের হাল ধরতে একটি চাকরির। আবেদন করেন পুলিশ কনস্টেবল পদে। যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে টিকেও যান সেখানে। তবে চাকরি পেয়েও স্বপ্ন পূরণ করতে হাল না ছেড়ে চালিয়ে যান পড়াশোনা।

নিজের কর্মজীবনের কথাগুলো সাংবাদিকদের বলেন আব্দুল হাকিম। তিনি বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেই ২০১৩ সালে পুলিশ কনস্টেবল পদে আবেদন করি। চাকরিটা মিলে যায়। প্রথমে পোস্টিং হলো গাজীপুরে শিল্প পুলিশে। শিল্প পুলিশে ডিউটি একটু কমই ছিল। কয়েক ঘণ্টা ডিউটি করলে বাকি সময়টায় কোনো কাজ থাকে না। সেই সময় ভর্তি হয়ে গেলাম নরসিংদী সরকারি কলেজে। ডিউটির ফাঁকে অবসর সময়টা পুরোপুরি লাগালাম পড়াশোনার কাজে। ২০১৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করলাম। স্নাতক সম্পন্ন করাটা সহজ ছিল না আমার জন্য।’

‘২০১৫ সালে পোস্টিং হয়ে গেল ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি)। পোস্টিং ছিল পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) বিভাগে। মিরপুরের পিওএম ব্যারাকে থাকতাম। শিল্প পুলিশ থেকে ডিএমপিতে এসে ডিউটি বেড়ে গেল অনেক। জীবন আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে গেল। প্রতিদিন ডিউটি করতে হয়।’

আবদুল হাকিম বলেন, ‘ডিএমপিতে আসার পর নানা জায়গায় ডিউটি করতে হতো। এত কঠিন ডিউটি আগের তিন বছরের শিল্প পুলিশের চাকরিতে আমি কখনোই পাইনি। তখন ২০১৫ সাল, আমার গ্রাজুয়েশন লাস্ট ইয়ার চলছিল। একদিন ডিউটি পড়ল আমিন বাজার সেতুর নিচে, গাবতলী এলাকায়। ওখানে এত মশা কামড়াচ্ছিল, সারারাত যে কীভাবে কাটল! তখনই মনস্থির করে ফেললাম–এভাবে পুলিশ কনস্টেবলের চাকরিতে থেমে থাকা যাবে না। আরও পড়াশোনা করতে হবে। পুলিশেরই ভালো কোনো পদে বা অন্য ভালো কোনো চাকরি করতে হবে। আমার শিক্ষকতা করার ইচ্ছে ছিল।’

হাকিম বলেন, ‘স্নাতক সম্পন্ন করে পদোন্নতি পেয়েছিলাম; কিন্তু সেই রাতের জেদ তখনও কাটেনি। পিওএম থেকেই গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে ফেললাম। গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরই আমার নায়েক র‌্যাংক লাগল। নায়েক র‌্যাংক পাওয়ার পর পোস্টিং হলো স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়নে। সেখানে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ ছিল। তখন ডিউটির পাশাপাশি ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা পড়াশোনা শুরু করলাম। রাত ২টা পর্যন্ত পড়তাম। আবার সকাল ৭টায় যখন রোলকল হতো, তখন আমার ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা। মাঝে মাঝে রোলকলের দায়িত্বে থাকা এএসআই বকতেন; কিন্তু তখন আমার রাগ চেপে গেছে। এই চাকরিতে থাকলে চলবে না, আরও অনেকদূর যেতে হবে।’

সুযোগ পেলেই ব্যারাকে (সেনাদের শিবির বা থাকার জায়গা) বইপত্র নিয়ে বসে পড়তেন জানিয়ে হাকিম বলেন, প্রটেকশন ব্যাটালিয়নে থাকার কারণে পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পেরেছি। লিখিত পরীক্ষার আগ পর্যন্ত প্রটেকশন ব্যাটালিয়নেই থাকলাম। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পোস্টিং হয়ে গেল গুলশানে ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি জোনে।

ওই বছরের শুরুতেই মাকে হারান হাকিম। এরপরও পড়াশোনার গতি থামেনি। হাকিম বলেন, গুলশানে পোস্টিং থাকা অবস্থাতেই ভাইভা দেই। গত বছরের ২৩ মার্চ আমার ভাইভা হলো। আর ৩০ মার্চ থেকে করোনার কারণে ভাইভা পরীক্ষা স্থগিত করলো পিএসসি। একবারে পরীক্ষা দিতে না পারলে আমার জন্য খুবই সমস্যায় পড়তে হতো। ভাগ্য ভালো যে আগেই পরীক্ষাটা দিতে পেরেছিলাম।

দেশের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখেন হাকিম। হাকিম বলেন, ‘অবশেষে সংগ্রাম করে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরে খুবই ভালো লাগছে আমার। একটা বিষয় হলো–মানুষ চেষ্টা করলে অনেক কিছু পারে। নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারলাম। সবার কাছে দোয়া চাই–আমি যেন দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারি।’ – কার্টেসিঃ ঢাকাটাইমস২৪

Facebook Comments