বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাঃ কোন পথে বাংলাদেশ?

 

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা কেবল বেড়েই চলেছে। কোভিড-১৯ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। সে যুদ্ধের প্রভাবেই বিশ্ব অর্থনীতির চৌদ্দটা বেজে গেছে। লেবানন, শ্রীলঙ্কার মত দেশগুলো দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়। জনমনে তাই কমন প্রশ্ন- কোন পথে বাংলাদেশ? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন কোন কাজ নয়। অনেকেই শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের সরকার পতনে উচ্ছ্বসিত হন কিন্তু এতটা উচ্ছ্বসিত হবার কোন কারণ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি এতটা ভঙ্গুর নয় যে ছোটখাটো একটা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারবে না। বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই ফরেইন রিজার্ভ কমছে। কমেছে বাংলাদেশেরও। তারপরও বাংলাদেশের যে পরিমান রিজার্ভ আছে তা দিয়ে ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা যদি দীর্ঘায়িত হয়? সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর চাপ বাড়বে তাতে দ্বিমত করার কোন সুযোগ নেই।

আমরা সবাই জানি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চেয়ে বড় কোন বিপর্যয় আর নাই। মাথাপিছু আয়, জিডিপি গ্রোথ রেট, মোটি জিডিপির পরিমান সবকিছুই সর্বকালের সেরা অবস্থায় আছে তারপরও বাংলাদেশের অর্থনীতি গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময়ের মুখোমুখি হয়েছে।

মাথাপিছু আয় বেড়ে ২৮২৪ মার্কিন ডলার! জিডিপির পরিমানও রেকর্ড ৪৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার!

তারপরও দেশের অর্থনীতি কেন এতটা চাপে? কারণ একটাই আমরা পেয়েছি চোরের খনি। এমন মহাসংকটের সময়ও ভোজ্যতেল রপ্তানি হয়- অধিক মুনাফার আশায়! কিছু, কিছু নেতা, আমলারা তো ধরেই নিয়েছে সামনের বছরই কেয়ামত হবে যে যত পারে কামিয়ে নেই! একটা দেশে যখন একই সাথে নেতা, আমলা এবং ব্যবসায়ীদের বড় একটা অংশ দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়েন তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা হয়তো রাশিয়া -ইউক্রেন যুদ্ধকে আর দশটা যুদ্ধের মতই ধরে নিয়েছিলাম বিষয়টা মোটেও সেরকম কিছু নয়। এটা বিশ্বের দুই পরাশক্তির সুপ্রিমেসির দ্বন্দ্ব। ইউক্রেনতো জাস্ট শোপিচ। আমেরিকা এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ইন্ধন না থাকলে ইউক্রেন কখনই যুদ্ধে জড়াতো না। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা আরও প্রকট রূপ ধারণ করবে। নিত্যপণ্যের আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে। দ্রব্যের মূল্য আস্তে আস্তে মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যাবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় যা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

আশংকটা আগেও ছিলো। গায়ে লাগেনি। লাগার কথাও না। কিন্তু কোভিড-১৯ আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব শেষমেষ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করলো।

শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারে নাই পারে নাই কারণ তাদের দেশীয় উৎপাদন সীমিত। শুধুমাত্র পর্যটন আর মৎস শিল্প দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। ২০১৯ সালে দেশটিতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয় এরপর থেকেই দেশটির পর্যটন শিল্প ধ্বস নামে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদান অনেক। সয়াবিন আমদানি বন্ধ হয়ে গেলেও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সেজন্য বাংলাদেশের সরিষার তেল আছে। বড় বড় অর্থনৈতিক মন্দার সময় নিত্য পণ্যের যোগানটা যদি দেশে থেকেই সিংহভাগ দেয়া যায় তাহলে সেই দেশটির জন্য মন্দা কাটিয়ে উঠা সহজ হয়। বিশ্বায়নের যুগে কোন দেশই নিত্য প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যের দেশজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার প্রয়োজনবোধ করে না। কারণ আমদানি-রপ্তানির সহজলভ্যতা। কিন্তু যখন কোন যুদ্ধ বেধে যায়- পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ কি?
পথ একটাই অতীতে যা হইছে হইছেই চুরি, দুর্নীতি বন্ধ করেন। আমলাদের দোষ দিয়ে লাভ নাই। ওনাদের কিছু লোক সুযোগ নেবেনই। ওনাদের ধর্মই এটা। যে সরকারই আসবে আমলারা সুযোগ নেবেই। কিন্তু কোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী যদি শতভাগ সৎ হন আমার মনে হয় না কোন আমলা চুরি, দুর্নীতি করতে পারবেন। সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সেই সাথে বিদেশে পাচারকৃত বড় অংকের টাকাগুলো দেশে আনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। সরকার চাইলে কালো টাকা সাদা করার মতন বিদেশে টাকা পাচারকারীদের টাকা দেশে আনলে সাদা করা কিংবা ক্ষমা করে দেশে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে অনেকে রাজিও হতে পারেন। দিনশেষ দেশের টাকা দেশে রাখা জরুরী।  টাকার অংকটা এতই বড় যে তা বাংলাদেশের মোট জিডিপির চাইতেও অনেক অনেক বেশি। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কথা মাথায় রেখে সরকারকে এখন প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে। কারণ আমাদের সমস্যাটা একটু জটিল। দুর্নীতি করে সে টাকা দেশেই রাখলে এত সমস্যা হতো না। এজন্য সরকারকে উপায় বের করতে হবে। পিকে হালদারদের মতন রাঘব বোয়ালদের ধরতে হবে। কাজটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। দেশ, মা, মাটি ও মানুষের জন্য যে এটুকু করতেই হবে।