ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফাইনাল নিয়ে উগ্রতা কাম্য নয়

উপমহাদেশের ক্রীড়া সমর্থকরা যে উগ্র তার বহু প্রমাণের মধ্যে অন্যতম ও বড় প্রমাণ হলো ক্রিকেট কিংবা ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোতে লোহার গ্রীল দিয়ে দর্শকদের গ্যালারীর বৃত্তের মধ্যেই আটকে রাখা। এটিতো খেলার সময় মাঠের অবস্থা, তার বাহিরে প্রিয় দলের সমর্থনকে ঘিরে তর্কবিতর্ক, জগড়া বিবাদ, মারামারি যেনো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। স্বয়ং ভারতে সমর্থকদের দ্বারা ধোনীদের বাড়ীতে আগুণ লাগিয়ে দেওয়া, বিদেশ সফরে ব্যর্থ হয়ে ফিরলে এয়ারপোর্টে জুতা-ঝাড়– মিছিল করা সহ বহু নগ্নচিত্র দেখা যায় ক্রীড়া সমর্থকদের দ্বারা। উপমহাদেশ ছাপিয়ে শুধুমাত্র বাংলাদেশের চিত্রটা তোলে ধরলে সেখানে ভালো সমর্থকদের বিপরীতে উগ্র সমর্থকদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশিই হতে পারে, যারা ক্রীড়াবিদদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করার মাধ্যমে পরিবারকে সহ অপমাণজনক কথাবলা কিংবা সমর্থক করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং সরাসরি লংকাকান্ড বাঁধিয়ে দিতেও পিছ পা হয় না। ক্রীড়া সমর্থন নিয়ে তর্কবিতর্কের জের বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে, মামলা মোকদ্দমা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
জাতীয় দলভিত্তিক ফুটবলের জন্য বিশ্বকাপের পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো নিয়ে কোপা আমেরিকা কিংবা ইউরোপের দলগুলোকে নিয়ে ইউরো কাপ, কনফেডারেশন কাপকে ঘিরে তুমুল উত্তেজনামূলক পরিস্থিতি তৈরী হয় বাংলাদেশে। বাংলাদেশে ইউরোপের দলগুলোর সমর্থকদের সংখ্যা অনেক কম, বিপরীতে ফুটবল সমর্থকদের সিংহভাগই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থক। কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে-মেরাডোনার সময় থেকে বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থনের গণজোয়ার শুরু হয়। আশি-নব্বই দশকে বাংলাদেশ ফুটবলে ভালো খেললেও কখনো বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থনে এতটুকু ভাটা পরেনি, বর্তমান সময় বিবেচনায় তা আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অপরদিকে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান সমর্থনও ছিলো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতোই ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন, পাকিস্তান ও স্কটল্যান্ডকে হারানো এবং ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা লাভের মাধ্যমে ক্রীড়া সমর্থকদের মধ্যে অধিকাংশের মনেই জায়গা করে নিয়েছে ক্রিকেট। ক্রিকেটে বিশ্বকাপ খেলা এবং ধারাবাহিক ভালো খেলার কারনে ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচকে ঘিরে পূর্বে যে সমর্থনের জোয়ার ছিলো, তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এখন।
বছর জুড়ে ক্লাব ফুটবল কিংবা প্রীতি ম্যাচ চললেও মূলত ফুটবল বিশ্বকাপ, ইউরো, কোপা আমেরিকা, কনফেডারেশন কাপগুলোর সময় বাংলাদেশের গ্রাম-শহরে ফুটবল সমর্থন নিয়ে তুমুল উত্তেজনা শুরু হয়। ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনার ম্যাচ ছাড়াও এই দু দলের ভিন্ন ভিন্ন দলের সাথে খেললেও সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়াঝাটি হয়। আর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হলে সমর্থন তখন যুদ্ধে রূপ নেয়। বিশেষ করে দীর্ঘ ১৪ বছর পর মেজর কোন টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, আর তাতেই শুরু হয়েছ লংকাকান্ড। দুই দল ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হওয়ার পর থেকেই সমর্থকদের মাঝে উত্তেজনা, তর্কবিতর্ক, অন্য দলের সমর্থকদের বাজে মন্তব্য, ফুটবলারদের নিয়ে অতিরঞ্জিত কিংবা তাচ্ছিল্যের মন্তব্য শুরু হয়। এসব তর্কবিতর্ক থেকেই ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারি পর্যন্ত হয়। চলমান কোপা আমেরিকায় ব্রাজিল বনাম পেরুর ম্যাচের শেষে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে ঝগড়ার এক পর্যায়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বেদম মারধর করেছেন ব্রাজিল সমর্থকরা,  ব্রাজিলের সমর্থকও মারধরের শিকার হয়েছেন। এই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। শুধু ব্রাহ্মণবাড়ীয়াতেই নয়, বিভিন্ন এলাকাতেই সমর্থন নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও মিডিয়ার কল্যাণে জানা যায়।
ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তানের সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশে যে তুমুল উত্তেজনা ছিলো এক সময়, তা বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেলা এবং ভালো ক্রিকেট খেলার কারনে কমে এসেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের মতো ফুটবল দল যদি বিশ্বকাপ খেলতে পারতো কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পারতো তাহলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থন নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই উত্তেজনা কমে আসতো বাংলাদেশে, বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে মর্মে দীর্ঘদিন পূর্বে আমাদের স্বপ্ন দেখালেও সে স্বপ্ন দিবাস্বপ্নই হয়ে আছে। আগামী বছর কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে তো দূরের কথা, মূল বাছাই পর্বেও খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ, এমনকি আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ফুটবলের অবস্থা খুবই নাজুক।
আগামী ১১ জুলাই সকাল সাত ঘটিকায় কোপা আমেরিকার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা। এ ম্যাচকে ঘিরে তুমুল উত্তেজনা চলছে দেশব্যাপী। ফাইনালে যেই জয়ী হোক, তা আমাদের মেনে নিয়ে স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখতে হবে। ফাইনালের পূর্বে কিংবা পরে কথার লড়াই ছাড়াও মারামারি হওয়ার আশংকা বিদ্যমান। এসব ঘটনার অধিকাংশই গ্রামা লে হয়, যারা ফুটবলকে ভালোবাসলেও নিজেদের স্বভাবজাতকারনে উগ্র আচরণ করে ফেলে মৌখিক তর্কের এক পর্যায়ে, যা কাম্য নয়। আমাদের সকলের উচিত ভদ্র ভাবে সমর্থন করা, তর্কবিতর্কটা মুখে মুখেই বজায় রাখা এবং নিজ প্রতিবেশীর সাথে বাজে ব্যবহার না করা, ফুটবলারদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করা, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হওয়া, মারামারি না করা। মনে রাখতে হবে ভিন দেশের ফুটবল নিয়ে আমরা আনন্দিত হতে পারি, ঝগড়া-মারামারিতে লিপ্ত হতে পারি না, এসব চরম উগ্রতা ছাড়া কিছু নয়। দেশের ফুটবলের ক্রান্তিকালে ভিনদেশের ফুটবল নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হওয়া চরম লজ্জাজনক বিষয়, যা আমাদের পরিহার করতে হবে এবং সেই সাথে বাংলাদেশ ফুটবলের পাশে থাকতে হবে। আমরা মানুষ যে সৃষ্টির সেরা জীব এবং বাঙ্গালী হিসেবে আমরা অসভ্য নই, তা প্রমাণ করার অন্যতম বিষয় হতে পারে খেলাধূলা নিয়ে সমর্থনও।
Facebook Comments