রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি কি?

যুদ্ধ তাই যখন ভাষা ব্যর্থ হয়’-কানাডীয় কবি ও পরিবশেবিদ মার্গারেট অ্যাটউড। সকল কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ করে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এখন যুদ্ধে পরিণত। রাশিয়া- ইউক্রেন বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি রাতারাতি শুরু হয়নি। ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থে রাশিয়া বছরের পর বছর পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির দেশ রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে ইউক্রেন অবস্থিত। রাশিয়ার পাশর্^বর্তী হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশে^র নিকট দেশটির অনেক গুরুত্ব রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। এমনকি ইউক্রেনকে সাথে নিয়ে যৌথ সামরিক মহড়াও দেয়া হয়। ইউক্রেন তার প্রতিরক্ষার গুরুত্ব অনুভব করে ন্যাটোর সদস্য হওয়ার আগ্রহ জানিয়ে আসছিল। সর্বশেষ সুইডেনের স্টকহোমে ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিষয়ক এক বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্গেই ল্যাভরভ ইউক্রেনের ন্যাটোতে অর্ন্তভূক্তির সিদ্বান্তের বিষয়ে কড়া প্রতিবাদ করেন এবং স্পষ্ট করে জানান দেন,’’ পূর্ব ইউরোপে ন্যটোর কোন তৎপরতা ইউরোপকে আবারো যুদ্ধের দু:স্বপ্ন দেখানো হতে পারে”।

অবশেষে কূটনীতি ব্যর্থ হয়ে গত ২৪ শে ফ্রেবুয়ারি, ২০২২খ্রি: রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর সর্বাত্মক সামরিক আক্রমণ শুরু করে। বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে রশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেনের উপর হামলা শুরু করেন যা কিনা আনুষ্ঠানিক সর্বাত্মক সামরিক অভিযান। ইউক্রেনের ইউরোপে ন্যাটো সম্প্রসারণে যোগ দেয়াকে যুদ্ধের রাজনৈতিক কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কির নাৎসিবাদ চালিয়ে দেশটিতে বসবাসরত রুশপন্থীদের উপর গত আট বছর দমন পীড়ন কার্যক্রম চলছে বলেও আক্রমণের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে। ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেয়াকে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখছেন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। অবশ্য রাষ্ট্রর বাস্তব রাজনীতির তত্ত্বের আলোকে এটি ভাবা অবান্তর নয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির উচ্চাকাঙ্খা ও দুর্বল কূটনীতিকে প্রাথমিকভাবে এ যুদ্ধ শুরু হওয়ায় অন্য একটি কারণ।


রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর বিভিন্ন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো, কানাডা রাশিয়ার ব্যাংক, গ্যাস-তেলকে তাদের আগ্রাসী নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করে। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ও তার পশ্চিমা মিত্ররা একের পর এক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞায আরোপ করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাশিয়াকে বিশ^ থেকে বিছিন্ন করে প্রাথমিকভাবে যুদ্ধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব অবরোধ আরোপ কার্যত রাশিয়াকে কি তার যুদ্ধ লক্ষ্যবস্তু হতে রাখতে পারবে? বর্তমান পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। মর্যাদার লড়াইয়ে পুতিন হয়তো পিছপা হবেন না। প্রাথমিকভাবে পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ব ছিলে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এ যুদ্ধে সরাসরি জড়িত হবে না বলে জানায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোও যুদ্ধে কোন সেনা পাঠাবে না বলে জানায়। পরবর্তীতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের লড়াকু ভূমিকা ও রাশিয়ার সামরিক আক্রমণ লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা একের পর এক সামরিক সহযোগিতাও দিয়ে যাচ্ছে । যুক্তরাষ্ট্র জরুরী ভিত্তিতে ইউক্রেনকে ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার,ফ্রান্স-জার্মানীও সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম দেয়ার ঘোষণা দেয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের প্রথম দিকে পশ্চিমাদের ঘোষণায় হতাশ হলেও বর্তমান পরিস্থিতেতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। ইউক্রেনের বেসামরিক জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে যুদ্ধে জড়িত হচ্ছে। এমনকি বিদেশেীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ইউক্রেনের পাশর্^বর্তী মিত্র দেশগুলো সব ধরণের সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু মিলে ইউক্রেন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জনে চেষ্টা করছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাশিয়া -ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী সংঘাত ইউক্রেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর দেশে পরিণত করবে। পাশাপাশি রাশিয়ারও অর্থনৈতিক ও সামরিক অপচয় উল্লেখ করার মতো হবে। বিশে^র অন্যান্য দেশও ভবিষ্যতে রাশিয়ান আক্রমণ মডেল রপ্ত করতে পারে। যেমন-চীন-তাইওয়ান। তাই তাইওয়ান রাশিয়ার এ হামলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি অনেক ক্ষুদ্র দেশ তার প্রতিরক্ষার স্বার্থে কোন সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করবে। সম্প্রতি কসভো তার প্রতিরক্ষার স্বার্থে ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য আওয়াজ তুলছে। আবার পাশর্^বর্তী বৃহৎ দেশের সম্মতি বা অসম্মতির বিষয়টিও যোগদানের আগে ক্ষুদ্র দেশগুলো বিবেচনায় রাখবে।
শান্তি আলোচনা কি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবিলম্বে অবসান করতে পারবে? শান্তি আলোচনা হতে পারে উভয় দেশের জন্যই একটি কূট কৌশল। যুুদ্ধ রাশিয়া-ইউক্রেন মধ্যে হলেও যুদ্ধ অবসানে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-মিত্ররা মূখ্য কর্মক। শান্তি আলোচনাকে যদি কোন দেশ সত্যিই গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখতো তাহলে আলোচনা চলা অবস্থায় আক্রমন পাল্টা আক্রমণ,অবরোধ পাল্টা অবরোধ কার্যক্রম চলার কথা নয়। এমনকি কোন সমাধান ছাড়া শান্তি আলোচনা শেষ হওয়ার পর দেখা যায় রাশিয়া ৪০মাইল দীর্ঘ সামরিক বহর কিয়েভের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে জাতিসংঘ থেকে ১২ রুশ কূটনৈতিককে গুপ্তচরবৃত্তির অজুহাতে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তী শান্তি আলোচনা থেকে কোন সফলতা আসবে কিনা এসব পরিস্থিতি ও কর্মকান্ড দেখে আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না।

রাশিয়া যুদ্ধের প্রথম দিকে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও ইউক্রেন পশ্চিমা বিশে^র সামরিক ,অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা ক্রমেই শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। রাশিয়া বর্তমানে সরাসরি বেলারুশ ছাড়া কোন দেশকে কাছে টানতে পারছে না। রাশিয়ার ওপর সর্বাত্মক অবরোধে চীন উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ইউক্রেনে এ হামলার ও বর্তমান অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাম্রাজ্যবাদকে দায়ী করেছেন। তবে রাশিয়া বিশ^ সমর্থনে ততোটা সফল হয়নি। এমনকি পুতিনের নিজ দেশেও এ যুদ্ধের বিপক্ষে জনমত গড়ে উঠছে। এখানে একটি বিষয় জোর দিযে বলতে হয়,রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণ থেকে ফিরে নিয়ে আসা কেবল একটি পথ খোলা। তা হলো পুতিনের নিজ দেশের জনগোষ্ঠীকে পুতিন বিরোধী জনমত গড়ে তুলা। পশ্চিমা বিশ^ হয়তো এ বিষয়টি মাথায় রেখে কৌশলে কাজ করে যাচ্ছে। তবে এটি খুবই দূরহ কাজ হলেও পুতিনকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার এটি কার্যকর প্রথম কৌশল হতে পারে। তবে রাশিয়ার মতো গণতন্ত্রবিহীন দেশে এই কৌশল বাস্তবায়ন করার চেষ্টাকে পুতিন সহজভাবে নিবে না। যুদ্ধ বন্ধ করার দ্বিতীয় এবং শেষ আরেকটি কৌশল হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিমা মিত্র দেশে সামরিক সাজ মোতায়েন কওে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে পুতিনকে ধারণা দেয়। জার্মানী সাত হাজার সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে এটি একটি জটিল সিদ্বান্ত হতে পারে যা কিনা ইরাক-আফগানিস্তানের মতো সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করে ফেলতে পারে। রাশিয়া তার যুদ্ধের লক্ষ্য পুরিপূর্ণ না করে নিজেকে গুটিয়ে নিলে ভবিষ্যতে ইউক্রেনের ওপর সামরিক কর্তৃত্ব হারাতে হবে। বিরাট আঘাত আসবে তার সামরিক কর্তৃত্বের উপর। কেননা ইউক্রেন আক্রমণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
০২ মার্চ, ২০২২খ্রি: দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা শুরু হলেও রাশিয়া বর্তমান অবস্থা থেকে পিছেয়ে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। কেননা পরাশক্তি রাশিয়া সব কিছু বিবেচনায় নিয়েই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এটা রাশিয়ার জন্য অবশ্যই মর্যদার লড়াই। যদিও কার্যত শান্তি আলোচনা সুযোগ হাত ছাড়া করা উচিত নয়। পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়ে রাশিয়া-ন্যাটো যুদ্ধ এখন সময়ের অপেক্ষামাত্র। এ পরিস্থিতিতে বৈঠক কার্যত কোন ফল নিয়ে আসার কথা নয়। এবং পরিস্থিতিও তাই বলছে। রাশিয়ার উপর একের পর এক পশ্চিমাদের আগ্রাসী অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা,পুতিনকে ইউক্রেন সরকারের পতনের চেয়ে দেশটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উচ্চাকাঙ্খার দিকে ধাবিত করবে। এক্ষেত্রে ন্যাটো বাহিনী যুদ্ধে জড়িত হলে পুতিন অবশ্যই প্রথাগত অস্ত্রেও বদলে কঠিন সিদ্বান্ত হিসেবে ভারী অস্ত্র এমনকি পারমাণবিক অস্ত্রকেও বিবেচনা নিতে পারেন। বেলারুশ ছাড়া অন্য কোন মিত্রকে বাহ্যিকভাবে কাছে টানতে না পারায় পুতিন এ সিদ্বান্তকে শেষ রক্ষা হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। রাশিয়া ক্রিমিয়া আক্রমণ করার কারণে তাকে ২০১৪ সালে জি-৮ থেকে বহিষ্কার করা হয়। রাশিয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আজও পুনরায় জি-৭ (বর্তমানে) এ প্রবেশ করতে পারে নি। ইউক্রেন আক্রমণকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার উপর যেসব আগ্রাসী নিষেধাজ্ঞা-অবরোধ আরোপ করা হয়েছে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে রাশিয়াকে দশকজুড়ে বিচ্ছিন্ন থাকতে হতে পারে। এর চেয়ে গত ২২ বছর রাশিয়াকে নেতৃত্বদানকারী দক্ষ ও উচ্চাকাঙ্খী ভøাদিমির পুতিন বিশ্বকে নতুনভাবে সাজানোর ঝুকি নিয়েও নিতে পারেন।
লেখক : কলামিস্ট।

Facebook Comments