আমাদের রসবোধ এবং অনধিকার চর্চার পাঁচালী

এই অসভ্য ব্যাপারটা যে অন্যায়-অনৈতিক-অশালীন, সেই বোধটাই আমাদের মধ্যে নেই। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে নিয়ে বরং আরো হাসিঠাট্টা হয়। আমাদের রসবোধ এতটাই নিম্নমানের যে, স্থূল একটা ব্যাপারকে এই জনপদে বিবেচনা করা হয় রসিকতা হিশেবে; অথচ পুরো ব্যাপারটাই অনধিকারচর্চা। এক দশক আগে ফেসবুকে কোনো ছবি আপলোড করতে ভয় পেতাম। কারণ, জানতাম আপলোড করলেই অনিবার্যভাবে তাতে মন্তব্য আসবে আমি এত শুকনো কেন, ভাত খাই না কেন, মাদক গ্রহণ করি কি না। শারীরিক আকৃতি তথা প্রকৃতিপ্রদত্ত কিছু নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার যদিও ঘনিষ্ঠতম কারোও নেই, তবু ঘনিষ্ঠ কেউ শারীরিক আকার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলে বা রস-রসিকতা করলে ক্ষেত্রবিশেষে তা হয়তো কোনোভাবে মানা যায়।

কিন্তু যাকে চিনি না, যে আমাকে চেনে না; তার কোনোভাবেই অধিকার নেই আমি শুকিয়ে বা মুটিয়ে যাচ্ছি কি না— তা নিয়ে প্রশ্ন বা মন্তব্য করার। কিন্তু এক দশক আগে আমাকে সর্বত্র শিকার হতে হয়েছে একটাই জিজ্ঞাসার— আমি এত চিকন কেন। শতভাগ অচেনা মানুষও মন্তব্য করে গেছে— ‘খালি কবিতায়ই বিদ্রোহ করলে হবে? হুম? গায়ে-পায়েও তো একটু গোশত থাকতে হবে, নাকি? কবিদের এত পাটকাঠি হলে চলে?’ কবিতার সাথে শারীরিক আকৃতির কী সম্পর্ক, কবিতা গোশত কেটে-কেটে লেখে কি না, দ্রোহের সাথে গোশতের কী সংশ্লেষ; তা না জানলেও এতটুকু জানি যে, জীবনে একটা সিগারেট পর্যন্ত মুখে দিইনি, পাশে কেউ সিগারেট ধরালে সেখানে অবস্থান পর্যন্ত করতে পারি না। অথচ শুকনো থাকাকালে উত্তর দিতে হয়েছে আমি মাদক নিই কি না!

আখতারুজ্জামান আজাদের সবগুলো বইয়ের তালিকা দেখুন

বয়সবৃদ্ধির সাথে-সাথে শারীরিক গঠনে যখন পরিবর্তন এসেছে, দেখতে যখন আগের মতো চিকন লাগে না; তখন ছবি আপলোড করলে অবধারিতভাবে এমন কিছু মন্তব্য থাকবেই— ‘ভাই কি কিছু ওয়েট গেইন করেছেন?’ ‘ভাই, মোটা হয়ে যাচ্ছেন কিন্তু!’ ‘আগের আপনাকেই কিন্তু ভালো লাগত, ভাই, মোটা হওয়ার পর আর ভালো লাগছে না।’ ‘ভাইয়ের ভুঁড়ি কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়নের মতো দিন-দিন সামনের দিকে আগাচ্ছে!’ শরীরে অতিরিক্ত কিছু মাংস যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিকভাবেই, এর পেছনে বা সামনে নিজস্ব কোনো হাত নেই। কিন্তু এক দশক আগের মন্তব্য পড়ে মনে হয়েছে তখন শরীরে মাংস কম থাকাটা ফৌজদারি অপরাধ ছিল, এখন মাংস বেড়ে যাওয়াটা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধ। আমি মডেলও নই, শরীরচর্চানির্দেশকও নই, ব্যায়ামসংক্রান্ত মোটিভেশনাল ওয়াজ করেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি পরিচিত হইনি; অর্থাৎ আমার কারবার শরীর নিয়ে নয়, আমার পরিচিতি লেখার কারণে। আলোচনা হতে পারে আমার লেখা নিয়ে, দৈহিক স্থূলতা বা কৃশতা নিয়ে নয়। যেচে পড়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উপদেশ দেওয়ার অধিকার রাখেন শুভাকাঙ্ক্ষী পর্যায়ের কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক। অন্য কেউ এই কর্ম করলে তিনি কোনোক্রমেই শুভাকাঙ্ক্ষী নন, তিনি শুভাখানকি।

আতঙ্কের আরেক নাম— ‘বিয়ে কবে করবেন?’ ‘আর কতকাল আপনার সিঙ্গেল ছবি দেখব?’ ‘ভাবিসহ ছবি দেখতে চাই।’ বিয়ে করব কি না, করলে কবে করব, কাকে করব— এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারেন পরিবারের সদস্যরা, ব্যক্তিজীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িতরা পেশাদার ঘটকরা অথবা সেই নারী, যে নিজেই আমাকে বিয়ে করতে চায়। যারা এই চার প্রজাতির মধ্যে পড়েন না, বিয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করা তাদের জন্য নিছকই অভদ্রতা। আমি বিয়ে করার পর আমার স্ত্রীকে যেহেতু প্রশ্নকর্তার সাথে কিছুদিন থাকতে দেবো না কিংবা আমি বিয়ে না করলে প্রশ্নকর্ত্রী যেহেতু কিছুদিনের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক স্ত্রী হয়ে আমার সাথে মালদ্বীপে মধুচন্দ্রিমায় যাবেন না, সেহেতু তাদের জানা নিষ্প্রয়োজন আমি বিয়ে করব কি না বা কবে করব।

সদ্যবিবাহিত কিংবা বিয়ে হয়েছে কয়েক মাস বা কয়েক বছর হয়েছে, এমন লোকজনের ছবিতে মন্তব্য দেখি— ‘তো? আমরা মামা হচ্ছি কবে?’ ‘তারপর? আমরা কি কখনও খালা হব না?’ ‘আর কতদিন দুজনের ছবি দেখব? হুম? এবার তিনজনের ছবি দেখতে চাই।’ ‘এখনও বাচ্চা নিচ্ছ না কেন? দ্রুত নিয়ে নাও, পরে কিন্তু ঝামেলা হবে।’ এমন মন্তব্যও এই পোড়াচোখে এই মড়ার ফেসবুকে দেখেছি— ‘সমস্যা কার? তোমার? না ফয়সালের? আমাকে ফ্রাংকলি বলতে পারো। কমেন্টে ঝামেলা থাকলে ইনবক্সে বলতে পারো।’ এই মন্তব্যটা পড়ার পর আমি কিছুক্ষণের জন্য সেরেফ তব্দা খেয়ে ছিলাম। একজোড়া দম্পতি— হয়তো নিজেরা পরিকল্পনা করে রেখেছে সন্তান পরে নেবে অথবা চেষ্টা করার পরও যেকোনো কারণে বাচ্চা হচ্ছে না এবং তা নিয়ে তারা রুদ্ধশ্বাস দুশ্চিন্তায়ও ভুগছে, তৎসত্ত্বেও পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবার কাছে তাদেরকে ব্যাখ্যা দিয়ে বেড়াতে হচ্ছে— ‘সমস্যা কার’!

সমস্যা আসলে এই গোটা জনপদটার। সমস্যা আমাদের এই বাঙালি জাতটার। সমস্যা আমাদের মন-মস্তিষ্ক-মগজের। জাতিগতভাবে আমরা অসভ্য, কায়িকভাবে আমরা অকর্মা, স্বভাবগতভাবে আমরা চশমখোর-চোগলখোর। খেয়েদেয়ে আমাদের কোনো কাজ থাকে না, আমাদের হাতে অখণ্ড অবসর। এই অবসরে বইপুস্তক না পড়ে ফেসবুকে স্ক্রল করে মুখমণ্ডলে আমরা গোয়েন্দা-গোয়েন্দা ভাব নিয়ে আবিষ্কার করি কে আড়াই কেজি শুকিয়েছে, কার ওজন সোয়া তিন কেজি বেড়েছে, কোন দম্পতি হাসি-হাসি ছবি আপলোড করছে না, কাদের ছবির ক্যাপশনে পিরিতের ঘাটতি আছে, বিয়ের দেড়বছর পরও কোন দম্পতি বাচ্চা নিচ্ছে না, সমস্যা কার— মিতুর না মোতাহারের, এক বাচ্চার বয়স পাঁচ পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোন দম্পতি এখনও দ্বিতীয় বাচ্চা নিচ্ছে না। যেসব দম্পতি দুটো বাচ্চা নিয়ে ফেলেছে, চারজনেরই শরীর-স্বাস্থ্য ভালো, খেয়েপরেও সুখে আছে; সেসব দম্পতিকে উপদেশ দিতে না পেরে আমরা ডিপ্রেশনে পড়ে যাই, খুঁজতে থাকি এমন কাউকে— যে শুকিয়ে বা মুটিয়ে যাচ্ছে, কালো হয়ে যাচ্ছে, যার চুল পড়ে যাচ্ছে; যে এখনও বিয়ে করছে না, করলেও বাচ্চা নিচ্ছে না, এক বাচ্চা নিলেও দ্বিতীয় বাচ্চা নিচ্ছে না। মন থেকে চাইলে যেহেতু সবই পাওয়া যায়, মন থেকে চাইলে তাই এমন শিকারও অনায়াসে মেলে; মেলার পর আমরা মাগনা মেলে ধরি উদ্ভট উপদেশের উটকো ঝুড়ি। কে কখন কাকে বিয়ে করবে, কবে কয়টা বাচ্চা নেবে, কে মোটা-চিকন বা কালো-ফর্সা হবে— এর জন্য এ দেশে আয়োজন করতে হয় গণভোট, চালাতে হয় জনমত জরিপ, তা নির্ধারণ করে দেয় চেনা-অচেনা বিজ্ঞ বিচারপতিরা।

এত-এত বিচারক আর বিশেষজ্ঞে ভরা দেশ কেন যে গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্সে প্রথম না হয়ে ১৩৮ দেশের মধ্যে ১১২তম হয়; এই ব্যাপারটাই যারপরনাই অবিশ্বাস্য, লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর। উপদেষ্টা আর উল্লুক উৎপাদনে আমরা বিশ্বে নিঃসন্দেহে প্রথম। অনধিকারচর্চার ইনডেক্সে এই ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

লেখকঃ আখতারুজ্জামান আজাদ
কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক

Facebook Comments