গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি বর্তমান সময়ে কতটুকু যৌক্তিক?

কিছুদিন পূর্বে গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো হতে আবাসিক গ্যাসের দাম দুই চুলা ৯৭৫ টাকা হতে ২১০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এটা ভালো কোন প্রস্তাব হলো না। এই প্রস্তাবের উপর পেট্রোবাংলা চিন্তা ভাবনা করবে, গণশুনানিসহ নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া শেষে নতুন একটা দাম নির্ধারণ করে দিবে।

বাংলাদেশে মোটামুটি ২/৩ বছর পর পর গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়। ২০১৫, ২০১৭ এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। বাসা বাড়িতে ব্যবহার করা গ্যাসের দাম ২০১৭ সালে ২২.৭০% বৃদ্ধি করা হয়। ২০১৯ সালে আবাসিকে দুই চুলার খরচ ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা করা হয়; যেখানে বৃদ্ধির পরিমান ছিল ২১.৮৮%। এবার এমন কোন বাস্তবতা কি সৃষ্টি হয়েছে যে একলাফে ৯৭৫ টাকা হতে ২১০০ টাকা অর্থাৎ ১১৫.৩৯% বৃদ্ধির প্রস্তাব করতে হবে?

আন্তর্জাতিক বাজারে কি গ্যাসের দাম এই হারে বেড়েছে? বাড়েনি। এ খাতে ভর্তুকি কমাতে হবে-মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটা যৌক্তিক। কিন্তু তারও একটা ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন। হঠাৎ করে এমন বৃদ্ধির প্রস্তাব অযৌক্তিক, ভোক্তা পর্যায়ে পীড়াদায়ক এবং অজনপ্রিয়ও বটে।

করোনাকালীন সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় এমনিতে নাভিশ্বাস উঠছে। আবাসিক খাতে গ্যাস দেশের গরীব, মধ্যবিত্ত, ধনী সবাই ব্যবহার করে। ধনীক শ্রেণির জন্য এই মূল্যবৃদ্ধিতে তেমন কিছু না আসলেও গরীব, মধ্যবিত্ত এবং একজন সৎ চাকুরিজীবির জন্য এটি কষ্টদায়ক হবে। ২০১৫ সালে পে-স্কেল এ বেতন বাড়ার পর ৬ বছর পার হয়ে ৭ বছর চলছে। বেতন যা বেড়েছিল এ পর্যায়ে এসে খরচ আর মূল্যস্ফীতির পাল্লায় সেটির প্রভাব ঋণাত্মক। আরেকটা পে-স্কেল বাস্তবায়ন এখন একান্ত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

গ্যাস খাতের সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা ঠিক না করে, নতুন উৎপাদনে না গিয়ে, গ্যাস চুরির সমস্যা সমাধান না করে সর্বোপরি দুর্নীতিযুক্ত ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে শুধু দাম বাড়িয়ে এই খাত টেকসই করা যাবে না। গ্যাসের দাম কিছুটা হলেও বাড়াতে হবে এটা হয়তো ঠিক। তবে গ্যাসের দাম বেশি বাড়ালে প্রাত্যহিক জীবন, শিল্প-কারখানায়, উৎপাদন-বিপনন ব্যবস্থা তথা ডিমান্ড-সাপ্লাই চেইন এ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যার অন্য নেতিবাচক প্রভাবও আছে এবং চূড়ান্ত চাপ পড়বে মাইক্রোলেভেলে ভোক্তার উপর। তাই গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে সেটা যেন যৌক্তিক পর্যায়ে বৃদ্ধি করা হয়। পূর্বের ধারাবাহিকতায় দাম বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ২০%-২২% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়। আবাসিক গ্যাসের দাম দুই চুলা ৯৭৫ টাকা হতে সর্বোচ্চ ১১৭০ টাকা বা এর আশেপাশে হতে পারে। এরচেয়ে বেশি কোনভাবে কাম্য নয়।

অন্যদিকে, আমাদের মতো দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যব্যবহার্য খাতে প্রোগ্রেসিভ প্রাইসিং (Progressive pricing) করা দরকার। গরীব, মধ্যবিত্ত, ধনী কিংবা বেশি-কম ব্যবহারকারী সবাই এক হারে কিংবা একই মূল্য পরিশোধ করবে এর বিকল্প ভাবনার প্রয়োজন। সম্প্রতি এক রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে মানুষ পরিবার প্রতি প্রতিমাসে প্রায় ৫০০ টাকার গ্যাস ব্যবহার করে। অথচ বিল পরিশোধ করে ৯৭৫ টাকা। যেখানে প্রিপেইড মিটারে মাসে ৬০০ টাকার গ্যাসেই ৬/৭ জনের ফ্যামিলি চলতে পারে সেখানে গনহারে ৯৭৫ টাকা নেয়া কিংবা এর মাঝে নতুন করে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবনা এতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে তা ভাবনায় অবকাশ রয়েছে। বিদ্যুৎখাতে একপ্রকার প্রোগ্রেসিভ প্রাইসিং থাকলেও সেটাকে আরো যৌক্তিক করার সুযোগ রয়েছে। এক চুলা, দুই চুলা এমন ২টা স্লাবে মূল্য নির্ধারণ না করে প্রিপেইড কিংবা পোস্টপেইড দুই ব্যবস্থায় গ্যাসের প্রোগ্রেসিভ প্রাইসিং করা যায়। গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে প্রোগ্রেসিভ প্রাইসিং ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে গ্রাহক পর্যায়ে মূল্য পরিশোধে অসহনীয় চাপ কমবে, অন্যদিকে গ্যাসের অতিব্যবহার এবং অপচয় রোধ করা যাবে।

লেখকঃ মোঃ আজহারুল ইসলাম
উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

Facebook Comments