প্যারেন্টিং: উৎসাহ এক মহৌষধ

জীবনে মানুষকে দেয়া মানুষের সেরা উপহারসমূহের একটি হলো উৎসাহ। যথাযথ উৎসাহ পেলে পলকা সৈনিকটিও বড় বীরত্ব দেখাতে পারে; আর শ্রেণীর শেষ সারির ছাত্রটিও সেরা ছাত্র হবার পণ করে চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে। হতবল মানুষের কাছে উৎসাহ জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার পথে এক অন্যতম মহৌষধ। আর উৎসাহের এ বিষয়টি শিশু কিশোরদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। শিশু-কিশোরদের মনো-জৈব-সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও সামগ্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে উৎসাহ ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
দুই
উৎসাহ দেয়ার অর্থ একগাদা উপদেশ দেয়া আর বড় বড় স্বপ্ন দেখানো নয়। অধিক উপদেশ আর বড় স্বপ্ন ধারণ করার ক্ষমতা শুরুর দিকে অনেকেরই থাকে না। এটাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। উৎসাহ দেয়ার অর্থ হলো মানুষের কথা মনযোগ দিয়ে শোনা। শিশু মানুষের ছোট ছোট সাফল্যের প্রশংসা করার মাধ্যমে তাদের দ্বারা যে অনেক বড় কিছু সম্ভব সে বোধকে জাগ্রত করা। উৎসাহ প্রদান হলো অপরের মঙ্গলে আগ্রহী হয়ে উঠা। উৎসাহ শিশু মনের উপর স্থায়ী দাগ কাঁটে। শিশু মনে আস্থা ও বিশ্বাসের ভিতকে শক্ত-পোক্ত করে।
তিন
মনোচিকিৎসকগণ বলেন মানুষ স্বভাবতই অন্যের মনযোগ আকর্ষণ করতে আর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুটিতে অবস্থান করতে চায়। ফলে শিশুদের ভাল কাজের দিকে মনযোগ দিন। তাদের সুন্দর সুন্দর কাজগুলো নিয়ে আলোচনা করুন। প্রত্যেকের সুকর্ম আপনার মনযোগের ন্যায্য দাবীদার। ভাল কাজ আর ভাল গুণকে পাত্তা দিন। উৎসাহ দেয়া হয়ে যাবে। একটু মুচকি হাসির বিনিময়ে একটু মুচকি হাসি গড়ে দিতে পারে শিশুদের সাথে আপনার সুন্দর সম্পর্ক তৈরির ভীত। সারা দুনিয়ার মানুষের হাসি আর কান্নার ভাষা এক। মানুষকে সুকর্মে উৎসাহিত করতে সর্বদাই এ দুটোর ডাকে সাড়া দিন। শিশুরা সহজে হাসি কাঁন্না করে, তাদের আবেগকে গুরুত্ব দিন।
চার
বাচ্চারা যখন অপ্রসংশনীয় বা অগ্রহণযোগ্য কোন কাজ করে প্রথমবার মনযোগ দিবেন না। সে এ কাজে আর উৎসাহ পাবে না এবং সম্ভবত আর এ কাজের পুনরাবৃত্তি করবে না। এ সময় আপনি তাকে ভালো কোন কথা বা কাজের দিকে মনযোগী হতে কৌশলে প্রবৃত্ত করতে পারেন। কিন্তু সরাসরি এ বাজে কাজটি করতে নিষেধ করলে সে বরং উৎসাহ পাবে। মানুষ স্বভাবতই না করলে বেশী করে। প্রথমবার মনযোগ না দেবার পরও পুনরায় অনুরূপ অগ্রহণযোগ্য কাজটির পুনরাবৃত্তি করলে এবার বুঝিয়ে বলুন। তারপরও কাজ না হলে আপনি মনযোগ দেয়া একদম বন্ধ করে দিন এবং প্রথমবারের কৌশল অবলম্বণ করতে থাকুন। পাত্তা না পেয়ে ধীরে ধীরে উৎসাহ অবদমিত হবে এবং মন্দ কাজটির পুনরাবৃত্তি করা বাচ্চা ছেড়ে দিবে বলে আশা করা যায়।
পাঁচ
বাচ্চাদের তাদের বয়স অনুযায়ী বই পড়তে উৎসাহিত করুন। প্রত্যেকটি বই পড়া শেষ হলে সে বইয়ের উপর কিছু প্রশ্ন করুন। যেটুকুই বলতে পারুক আপনি উচ্চ প্রশংসা করুন। বই বাচ্চাদের চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যত গঠনে অসামান্য অবদান রাখতে পারে। বাসায় ছোট হলেও একটি গ্রন্থাগারের মতো কর্নার রাখুন। বইগুলোকে বাচ্চাদের কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করুন। বাচ্চারা পড়তে আগ্রহী হবে। আর একবার বই পড়ায় আনন্দ খুঁজে পেলে বাচ্চাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার আর তেমন কিছু নেই। একেকটি বই একেকটি গুপ্তধন। এর সন্ধান বাচ্চা একবার পেলে বাচ্চার মানসিক বিকাশ আশাতীত উন্নতির পথে ধাবমান হবে।
ছয়
নিজের বাচ্চা সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু না বলে এবং অন্যের বাচ্চার সঙ্গে নিজের বাচ্চার তুলনা না করে অন্য বাচ্চাদের ভালো কাজের প্রশংসা করুন। অন্য বাচ্চাদের ভালো দিক নিয়ে আলোচনা করুন। কখনো তুলনায় যাবেন না। অন্য বাচ্চার ভালো কাজের প্রশংসা আপনার নিজের বাচ্চাকে ভালো কাজের মাধ্যমে অনুরূপ প্রশংসা অর্জনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করবে।

শেষ
অনুকরণীয় অনুসরণীয় ব্যক্তিদের মত সরাসরি হতে বলার মধ্যে কোন উৎসাহ নেই। সন্তানদের কাছে অনুকরণীয় অনুসরণীয় ব্যক্তিদের জীবনচিত্র তোলে ধরুন- উৎসাহ গল্পচ্ছলে পেয়ে যাবে। মানুষ অনুকরণপ্রিয়। আর শিশুরা সর্বাপেক্ষা বেশি অনুকরণপ্রিয়। উৎসাহ অনুকরণে প্রভাবক।

১১ বৈশাখ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
রবিবার, ঢাকা।

Facebook Comments