বাংলা সাহিত্য পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্য তাতে কারও কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। কারণ আমাদের সাহিত্য হাজার বছরের পুরোনো এবং সমৃদ্ধ। এখানে শত, সহস্র কবি সাহিত্যিক এসছেন। তন্মেধ্যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম খুবই স্পেশাল। কারণ তার বহুমাত্রিকতা এবং চির বিদ্রোহী চেতনা। যিনি একাধারে প্রেম, দ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের কবি ছিলেন। উপমহাদেশে যে সময়টাতে মানুষ খুব বেশি সাম্প্রদায়িক ছিলেন সে সময়টাতেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার দারুণ এক সূর্য হয়েছিলেন নজরুল। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মদিনে সরকারি মুজিব কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নূর মুহাম্মদ নূর লিখেছেন- বাংলা সহিত্যের অসম্প্রদায়িক চেতনার প্রবাদ পুরুষের কথা বলছি শিরোনামে।

কিছু ‘দ্বীনি ভাই’য়ের লেখালেখি,ফেসবুক পোস্ট কিংবা বক্তৃতা-বিবৃতি দেখে মনে হয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জামাতের সমর্থক ছিলেন। আবার বিরোধী দলের লেখালেখি দেখে মনে হয় ধানের শীষকেই নজরুল বেশি পছন্দ করতেন। না হলে লিখলেন কেনো
‘আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল।
কিংবা ” কারার ঐ লোহকপাট
ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট ।”
অথবা “লাথি মার ভাঙরে তালা
যতসব বন্দীশালা ।”
আবার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখায় মনে হয় তিনি মূলত আওয়ামী লীগেরই সমর্থক। বঙ্গবন্ধু সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেন এবং জাতীয় কবির মর্যাদা দেন।

হুমায়ূন আজাদ অবশ্য নজরুল ইসলামকে মোল্লা কবি, মুসলমানের কবি কিংবা ‘সাম্প্রদায়িক পাগল’ কবি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন।এখানে মোল্লা-মৌলভীদের সঙ্গে আজাদের মিল রয়েছে। মোল্লা-মৌলভীরাও নজরুলকে মুসলমানের কবি হিসেবে গুণগান করেন। অনেক মোল্লা-মৌলভীর সঙ্গে নজরুল ইসলাম নাকি স্বপ্নযোগে সাক্ষাতও দেন। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মাওলানা তারেক মনোয়ার এক বয়ানে বলেছেন, প্রিয় কবি তার সঙ্গে স্বপ্নযোগে দেখা করেছেন এবং তিনি কবিকে গজল শুনিয়েছেন। তাছাড়া কবি নাকি নারায়নগঞ্জ এসে ‘পায়খানার’ নামকরণ করেছেন ‘যায়খানা’।কী সুন্দর নাম! অবশ্য মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ নজরুলের গজলে শিরকের উপাদান খুঁজে পেয়েছেন বলে বয়ান করেছেন। এ ক্ষেত্রে মাওলানা তারেক মনোয়ার ও মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ বিপরীত অবস্থানে।

গবেষক জাকির হোসাইন নজরুলকে মুসলমানের গৌরবও ঐতিহ্যের কবি বলে ব্যাখ্যা-বক্তৃতা করেছেন। তরুণ কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ অবশ্য নজরুলকে এরশাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন,”একইসাথে সৈনিক, কবি, রাজনীতিবিদ ও একাধিক বউয়ের স্বামী, এমন কেইস বাংলায় মাত্র দুইটা আছে। যার প্রথমজন হচ্ছেন নজরুল, আর দ্বিতীয়জন হচ্ছেন এরশাদ।”

তরুণ কবি শোয়েব সর্বনাম অবশ্য নজরুল ইসলামের গাড়ি বিলাসের চিত্র তুলে ধরছেন। তিনি লিখিছেন, “কাজী নজরুল ইসলামের বিলাসবহুল গাড়ি ছিল ২ টি। একটা ক্রিসলার, ডাউন পেমেন্ট দিয়ে কিনছিলেন। আরেকটা অস্টিন। ৩২ মডেলের অস্টিন গাড়িই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়।
গাড়ির ড্রাইভারের নাম ছিল চণ্ডী। এটাতে চড়ে দুই ছেলে কাজী সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ কাজী স্কুলে যেতেন।

প্রথম আলোর সূত্র দিয়ে ব্যাংকার আরাফাত রহমান লিখেন, “একদিন হলো কি, বন্ধু পাঁচু এয়ারগান কিনে এনেছে। নজরুল সেটি বগলদাবা করে চললেন খ্রিষ্টানদের কবরখানায়। পাখি বাদ দিয়ে এয়ারগান তাক করলেন সিমেন্টের বেদির দিকে। তারপর আক্রোশে গুলি ছুড়তে লাগলেন ঠুসঠাস।

নজরুলের কাণ্ড দেখে শৈলজানন্দ অবাক, এসব কী হচ্ছে? নজরুল বললেন, ইংরেজগুলোকে খতম করছি। ইংরেজদের ওপর নজরুলের ভীষণ রাগ। ওরা দেশের শত্রু। তাই কবরস্থানের সিমেন্টের বেদিগুলো একেকটি বড়লাট, ছোটলাট, ম্যাজিস্ট্রেট মনে করে নজরুল গুলি ছুড়তেন। কারণ ওই একটাই—যুদ্ধ করে হলেও ওদের তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করতে হবে।”

সাহিত্যের শিক্ষক সুজন হামিদ নজরুল ইসলাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে সমাজে প্রচলিত রবীন্দ্র-নজরুল মিথের নানা অংশ তুলে ধরেন।তিনি লিখিছেন, “নজরুল নাকি আক্ষেপ করে বলেছিলেন-
পূর্বে যদি না উঠিত রবি
আমি হতাম বিশ্বকবি।
পরে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স এবং এম.ফিল করেও এমন কোনো পঙক্তি খোঁজে পেলাম না! যদি থাকে কেউ জানলে জানাবেন। বিশ্বকবি হওয়ার কোনো মোহ সম্ভবত নজরুলের ছিল না। বিপ্লবী কখনো বিদ্রোহের মোহের বাইরে যায় না। বিশ্বকবি হলে বিপ্লব করা যায় না- এই সত্যটি মনে হয় নজরুল অনুভব করেছিলেন। তিনি রইলেন পরম বিরহী ও চরম বিদ্রোহী ‘বেয়াদব’ কবি হয়েই! বাঙালির নতুন চণ্ডীদাস, আমাদের চারণ কবি কাজী নজরুল ‘ইসলামবিদ্বেষী’ (?) এই মানুষটা মাত্র আধা ঘণ্টায় লিখলেন:

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ইদ”,
লিখলেন নবি স. কে নিয়ে অনেক জনপ্রিয় গান, গজল লিখলেন, শ্যামাসঙ্গীতও লিখলেন। আর নিন্দুকেরা বলল-
নজরুল তুমি করিয়য়াছ ভুল
দাড়ি না রেখে রাখিয়াছ চুল!”

সুজন হামিদের শেষ কথা হচ্ছে ,বাংলা সাহিত্যের শান্ত সমুদ্রের নাম রবীন্দ্রনাথ, সেই সমুদ্রের উন্মাতাল ঢেউয়ের নাম কাজী নজরুল ইসলাম। লেখক গবেষক রাজিক হাসান অবশ্য শোয়েব সর্বনামের বিপরীত কথা বলেছেন। তিনি নজরুলের পারিবারিক দুঃখ-দুর্দশা -রোগ-শোকের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,”নজরুল ও প্রমীলার বিবাহিত জীবন ছিল দুঃখে দারিদ্র্যে ভরা। নজরুল নিজের প্রতিভাবলে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও তা রাখার মত বিষয়বুদ্ধি তাঁর ছিল না। খানিকটা দায়িত্ববোধহীন ও ভোলাভালা ধরণের ছিলেন। সম্ভবত তার কারণ হল, নজরুল নিজে কোন পারিবারিক জীবন পান নি। তিনি ছিলেন তাঁর বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর ষষ্ঠ সন্তান। শিশুকাল থেকেই তিনি বাড়ির বাইরে, কখনও অনাথ আশ্রমে কখনও চায়ের দোকানের কর্মী, এভাবেই কেটেছে তাঁর ছোটবেলাটা। তিনি যখন গানে অভিনয়ে কাব্যে সাহিত্যে খ্যাতির মধ্যগগনে ছিলেন তখন তাঁর বন্ধুবান্ধবের বৃত্তটিও ছিল বিশাল।

কিন্তু নজরুল যখন অসুস্থ হলেন (১৯৪১) ও মূক হয়ে গেলেন তখন তাঁর পাশে সেবা করার জন্য ছিলেন কেবল তাঁর স্ত্রী প্রমীলা দেবী। যে সব বন্ধুবান্ধব সব সময় তাকে ঘিরে থাকত, একসাথে গানবাজনার আসর বসাত, চা পান চলত তারা সবাই তাঁর দুর্দিনে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। এমন কি তাঁর আত্মীয়স্বজনও তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয় নি। এইভাবে প্রায় দশ বছর কেটে গেল।”

কবি সোহেল হাসান গালিব নজরুলের দারিদ্র্য বন্দনার নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখিছেন, “হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।’—এটা মূলত ব্যাজস্তুতি। এবং তা বুঝতে পারে নি অধিকাংশ বাঙালি। আমারও বুঝতে সময় লেগেছে অনেক দিন। এই বাক্যের আশল অর্থটা তাহলে কী? সহজ কথায় বলা যায় : দারিদ্র্য, তুমি আমারে মাইরা ফেলছ। কিন্তু স্কুল-পরীক্ষায় ভাব-সম্প্রসারণ করতে গিয়ে আমাদের লিখতে হতো, অর্থই অনর্থের মূল। দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে না গেলে মানুষরতন হয়ে ওঠা যায় না। এই যে নজরুল এত বড় হয়েছেন, এই যে তিনি এত দুঃসাহসী, তার কারণ দারিদ্র্য। এইটুকু লিখবার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে খটকা লাগত, তাহলে রবীন্দ্রনাথ বড় হলেন কিসের ছলে? সে কি বৌদির নয়নজলে, না ওকাম্পোর জাদুবলে?

পরে কবিতাটা পড়ে দেখি আশল কথাটা বলা আছে শেষে : ‘দারিদ্র্য অসহ/ পুত্র হয়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ/ আমার দুয়ার ধরি।’ ইনফ্যাক্ট পুরো কবিতার মধ্যে দারিদ্র্যের পীড়নের কথাই বলা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও কিভাবে, কেন এর একটা ভুলপাঠ আমাদের শেখানো হলো?

এর কারণ সম্ভবত আমাদের শিক্ষকদের মনস্তত্ত্ব। জ্ঞানচর্চার মধ্যে থেকে, খানিকটা সৎ কিন্তু অনেকখানি সংকুচিত জীবনকে যাপন করে ক্লান্ত হতে হতে, প্রতিবেশী অর্ধশিক্ষিত ঠিকাদার/দারোগা/কানুনগো সম্প্রদায়ের শনৈ শনৈ উন্নতি দেখে বিভ্রান্ত হয়ে আত্মশুশ্রূষার তাগিদে এই কবিতার ভুল ব্যাখ্যা তারা তৈরি করে নিয়েছেন বলেই মনে হয়। “

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভার নাম। এ প্রতিভার স্ফুরণ সূর্যের ন্যায়। সাত রঙে যেমন রংধনু তেমনি সাত স্তরে নজরুল পরিপূর্ণ। তাঁর জীবন ও কর্মের কোন একটি দিক বিবেচনা করেই বলা যাবে না নজরুল মূলত এই। বর্ণিল জীবন ও কর্মের ব্যাপ্তির কারণে তাঁর আলোচনা সমালোচনাও বেশি।নজরুল এমন এক কবি যাকে নাস্তিক বলা যাবে, আস্তিক বলা যাবে, আশেকে রাসূল বলা যাবে, বাম বলা যাবে, ডান বলা যাবে, জামাত বলা যাবে, বিএনপি বলা যাবে, আওয়ামী লীগ বলা যাবে, উন্মাদ বলা যাবে,ধনী বলা যাবে, গরিব বলা যাবে, সুখী বলা যাবে, অসুখী বলা যাবে ।

মূলত সাত চল্লিশের বিভাজনের ফলে নজরুল-রবীন্দ্র বিভাজনও তৈরি হয়।অত্যন্ত সুকৌশলে এ বিভাজন তৈরি করে পাকিস্তান সরকার।তারা রবীন্দ্রনাথের বিকল্প হিসেবে নজরুলকে স্থাপন করতে চেয়েছে। তাদের এ হীনকৌশল থেকে উত্তারাধিকা়র সূত্রে আমরা নজরুল-রবীন্দ্র বিতর্কে মশগুল। নজরুল-রবীন্দ্র মিথের অধিকাংশই পাকিস্তানের তৈরি। নজরুলকে খণ্ডিত করার সুযোগ নেই। নজরুল বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক কবি। তাঁর এক হাতে মোহন বাঁশি ,অপর হাতে রণতূর্য। দেশের স্বাধীনতা ও গণমানুষের মুক্তিই নজরুলসত্তার মূল আরাধনা। জন্মদিনে নজরুলের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

লেখকঃ এনএম আল নূর
বিভাগীয় প্রধান
বাংলা বিভাগ, সরকারি মুজিব কলেজ, নোয়াখালী

আপনার মন্তব্য