শেষ ১০ বছরে ৮৮০ দিনই মাঠের বাইরে নেইমার

কেউ কেউ মজা করে বলতে পারেন, যে জীবন চোটের সেটাই নেইমারের! চোট তো কতরকমই হয়। মনের চোটের তো আর হিসাব হয় না। নেইমার এমন চোট কতবার পেয়েছেন তা শুধু তিনিই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু খেলার মাঠে তাঁর শারীরিক চোটের কিছু হিসাব রাখা গেছে। ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে নেইমার বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর পিএসজি মিলিয়ে এই ১০ বছরে ৮৮০ দিন চোটের কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন। ম্যাচ মিস করেছেন ১৪৫টি। আর এ সময়ে মোট ৩৩বার চোটে পড়েছেন নেইমার।

২০০৯ সালে সান্তোসে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেন নেইমার। ৪ বছর পর যোগ দেন বার্সেলোনায়। সান্তোসে থাকতে তাঁর চোটের হিসেব ট্রান্সফারমার্কেটে নেই। ২০১৩ সালের ৩ জুন নেইমারকে বার্সা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর পরের বছর ১৬ জানুয়ারি প্রথম চোটে পড়েন। হ্যাঁ, এবারের মতো অ্যাঙ্কেলের চোট।

প্রথম চোটেই ৩২ দিনের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েছিলেন নেইমার। আর এই অ্যাঙ্কেলের চোটই নেইমারের ক্যারিয়ারে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই একই চোটের কারণে নেইমারের মৌসুম শেষ হয়ে গেছে বলে কাল জানিয়েছে তাঁর ক্লাব পিএসজি।

সিবিএস স্পোর্টসের প্রতিবেদক জোনাথান জনসনের একটি কথায় বোঝা যায়, ব্রাজিল তারকার এই চোট কতটা মারাত্নক, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডান অ্যাঙ্কেলে তার বার বার চোট পাওয়া কথা বললে তাকে অবমূল্যায়ন করা হয়।’ কারণ ২০১৭ সালে পিএসজিতে আসার পর নেইমার দৌড়ানো দূরে থাক, হাঁটতে যে পারছেন সেটাই অনেক কিছু! অথচ এমন চোটপ্রবণ অ্যাঙ্কেল নিয়েই খেলছেন মৌসুমের পর মৌসুম।

সান্তোস থেকে নেইমার যখন ইউরোপিয়ান ফুটবলে পা রেখেছিলেন তখনই কথা উঠেছিল, এই মহাদেশের শক্তপোক্ত ফুটবলে নেইমার টিকবেন তো? নেইমার শুধু টিকে যাননি, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু তা কীসের বিনিময়ে? অনেক কিছুরই বিনিময়ে আর সেখানে অ্যাঙ্কেলের চোটের একটা বড় ভূমিকাও আছে।

বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর এ পর্যন্ত ৫বার অ্যাঙ্কেলের চোটে পড়েছেন নেইমার। সেই প্রথম চোটে ৩২ দিনের জন্য ছিটকে পড়ার পর ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো অ্যাঙ্কেলের চোটে পড়েন এবং ২৭ দিনের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েন। ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর আবারও অ্যাঙ্কেলে চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যান ৭৩ দিনের জন্য। গত বছর নভেম্বরে একই কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন ৯ দিন। আর গত ২০ ফেব্রুয়ারি লিলের বিপক্ষে ম্যাচে ডান পায়ের অ্যাঙ্কেলে সর্বশেষ চোট পান।

পিএসজি জানিয়েছে, নেইমারকে তিন থেকে চার মাসের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হবে। সর্বোচ্চ চার মাস ধরে নিয়ে ট্রান্সফারমার্কেট হিসাব করেছে ৩০ জুন পর্যন্ত মাঠের বাইরে থাকবেন পিএসজির এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। তবে এই হিসাবই চূড়ান্ত নয়। তার আগে কিংবা পরেও মাঠে ফিরতে পারেন নেইমার। সে যাই হোক, ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাব অনুযায়ী এবারের চোটে ১৩০ দিন মাঠের বাইরে থাকতে হবে তাঁকে। যদি তাই হয়, তাহলে নিজ ক্যারিয়ারে চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকার আগের রেকর্ড ভেঙে ফেলবেন নেইমার।

নেইমার এর আগে চোটের কারণে মাঠের বাইরে থেকেছেন সর্বোচ্চ ৯০ দিন। ২০১৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মার্শেইয়ের বিপক্ষে ম্যাচে পায়ের মেটাটারসালে (আঙুল ও গোড়ালির মাঝের হাড়) চোট পান নেইমার। তখন পিএসজির হয়ে ১৬ ম্যাচ মিস করেছিলেন। পরের বছর ২৪ জানুয়ারি আবারও একই জায়গায় চোট পেয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েন ৮৫ দিনের জন্য। সেবারই সবচেয়ে বেশি ম্যাচ মিস করেন নেইমার। পিএসজি ১৮ ম্যাচে তাঁকে পায়নি। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত চোটে ভোগার পর মাঠে ফিরলেও বেশিদিন থাকতে পারেননি। ৭ জুন অ্যাঙ্কেলে চোট পেয়ে আবারও মাঠের বাইরে চলে যান ৬৩ দিনের জন্য।

লিওনেল মেসি, নেইমার আর সুয়ারেজ যখন বার্সায় ছিলেন তবে গত দুই–তিন বছরে এর চেয়েও বেশিদিন মাঠের বাইরে থেকেছেন নেইমার। ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর অ্যাঙ্কেলের চোটে মাঠের বাইরে ছিলেন ৭৩দিন। মোটামুটি মেটাটারসাল এবং অ্যাঙ্কেল—এ দুটি জায়গার চোটই বেশি ভুগিয়েছে নেইমারকে। অর্থাৎ তাঁর পায়ের পাতার গোটা অংশটুকুই চোট–জর্জর। জোনাথন জনসন তাই ভুল বলেননি! নেইমার যে হাঁটতে পারেন সেটাই অনেক!

তবে এবার অ্যাঙ্কেলের চোট সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। চোটের কারণে এবারই সবচেয়ে বেশিদিন (১৩০) মাঠের বাইরে থাকতে হচ্ছে নেইমারকে। মৌসুমের বাকি সময়ে আর মাঠে না ফিরলে পিএসজির জার্সিতে পরের মৌসুমে তাঁকে দেখা যাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। এ মৌসুমের শুরু থেকেই গুঞ্জন আছে, মৌসুম শেষেই নেইমারকে বেচে দেবে পিএসজি। চোটের কারণে ব্রাজিল তারকা এখন পিএসজিকে প্রত্যাশিত সেবা দিতে না পারলে ব্যাপারটা আরও জটিল হওয়াই স্বাভাবিক।

পিএসজি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে মরিয়া। আগামীকাল রাতে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ফিরতি লেগে নেইমারকে পাবে না তারা—সেটা তো এই চোটের কারণেই। এমন গুরুত্বপূর্ণ সব ম্যাচে তাঁকে না পেলে ক্লাব অন্যকিছু ভাবতেই পারে। তাতে অবশ্য নেইমারের দোষ কতটুকু?

সব দোষ তো চোটের!