সাহনিন সুলতানার একটি ছোট গল্প ‘স্মৃতির পটে আখ ক্ষেত’

কবি ও লেখক সাহনিন সাহনিন সুলতানার একটি ছোট গল্প ‘স্মৃতির পটে আখ ক্ষেত’। জনপ্রিয় বাংলা অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ ট্র্যাকারে গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পাঠকদের জন্য সে গল্পটিই হুবুহু তুলে ধরা হলো।

স্মৃতির পটে আখ ক্ষেত
সাহনিন সুলতানা


আমার শৈশব যে কত মধুর ছিল তা বলে এক জীবনে শেষ হবে না। বিশেষ করে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত।
আম জাম কাঁঠাল কলা পেঁপে তেঁতুল ডেওয়া জাম্বুরা জামরুল ডাব নারকেল যেমন খেয়েছি তেমনি যোগ হতো আখ মিষ্টি আলু। তবে এ-সব আমাদের বাড়িতে যেমন ছিল তেমনি ছিল নানাবাড়িতে। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে ফোকন কাকা আখের প্রজেক্ট করেছিল। আগেও আখ হতো৷

যুদ্ধের সময় আখ ক্ষেতের জন্য আমার দাদা জানে বেঁচে গিয়েছিলেন। যখন বাড়িতে মেলেটারি ঢুকে পড়ে তখন দাদা পিছন দরজা দিয়ে আখ ক্ষেতে গিয়ে লুকিয়ে বেঁচে যান৷ কিন্তু তার দুই ছেলে তাদের হাতে ধরা পড়ে। পিটমোরা দিয়ে বেধে গুলি করবে তার আগে কাকতালীয় ভাবে এক মিলিটারি কে চাচি চিনে ফেলাতে তাদের ছেড়ে লুটপাট করে সোনা গহনা নিয়ে চলে যায়। উদ্দেশ্য এটা লেখা নয়। তবু মনে পড়ে গেলো তাই লিখে ফেললাম। আগেই বলেছি আমি খুবই দুষ্টু না হলেও করিনি এমন কোনো কাজ নাই৷ যে-সব কাজ গ্রামের মানুষ করে থাকে৷ পিকনিকের জন্য মাছ মারা মুরগী চুরি করা, অন্যের গাছের সবজি এনে রান্না করা। নিজেদের ঘর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে অন্যদের ঘরে যেয়ে রান্না করে খাওয়া।

পাখির বাসা ভাঙ্গা মাছের পোনা মারা, মা মাছ বড়সি ও কোচ দিয়ে কুপিয়ে মারা, জাল ফেলে মারা সবই আমি করেছি৷ আঠা দিয়ে দোয়েল পাখি মারা, সুতা দিয়ে ফাঁদ পেতে কবুতর শালিক চড়ুউ পাখি মারা আমার জন্য কোনো ব্যপারই ছিল না৷ গাছে উঠে কতো বাসা ভেঙে পাখি ধরেছি ডিম এনেছি৷
একবার শাস্তিও পেয়েছি৷ তারপর থেকে পাখি মারা বাদ দিয়েছি।
ঘটনাটা না বলে পারছি না৷
একদিন একটা বাসা থেকে একটা শালিক ধরে এনে জবাই করে খেয়ে ফেলি৷ পরের দিন আবার বাসায় গিয়ে দেখি দুটো ডিম। কিন্তু একটা পাখি তো আমি ধরে খেয়ে ফেলেছি৷ তখন খুব খারাপ লাগলো। ভাবলাম আর কোনোদিন পাখি ধরবো না। কিন্তু প্রায় পনেরো দিন পরে একটা গাছের কোঠরে একটা পাখির বাসা ছিল। কিন্তু আমি তো আর পাখি ধরবো না। তবু ভাই-বোনেরা গাছে উঠে আমাকে দেখতে বলল পাখি আছে কি-না । কারণ অন্যরা গাছে উঠতে পারে না৷ কিন্তু আমি সব গাছেই উঠতে পারি তাই সবাই যখন পিড়াপীড়ি করলো তখন গাছে উঠে সেই কুঠরী তে হাত দিতেই বল্লায় কামড় দেয়৷

পাখি চলে যাবার পর বল্লায় বাসা বানিয়েছিল তা কেউই জানতো না৷ কামড় খাবার পর মনে হতে লাগলো আমি পাখি মেরেছি বলেই হয়তো আল্লাহ আমাকে এমন শাস্তি দিলেন৷
আর আমি পাখি মারিনি বা এটা ভুলতেও পারি না।

কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে আসলাম।
এবার আসি আসল কথায়। সে-ই মজা সেই আনন্দ সেই চুরি৷ যদিও ওসব জমি আমাদের বাপ চাচাদেরই ছিল৷ অন্যরা বর্গা চাষ করতো। আমরা স্কুলে যাবার সময় আখ ক্ষেতে ঢুকে পছন্দমতো আখ ভেঙে খেতে খেতে স্কুলে যেতাম৷ খেলতে গিয়ে আখ খেতাম। এছাড়াও আমাদের বাড়িতে গরু দিয়ে আখ মাড়াই করতো।
এখন সে-সব মেশিন দেখা যায় না৷ অবশ্য এখন রাস্তাঘাটে আখের রস খাওয়ার জন্য ছোট ছোট মেশিন দিয়ে রস বের করে৷ আমাদের সময় লম্বা গাছের সাথে গরু বেধে ঘুরানো হতো।

আমরা যখন আখ বাছাই করতো তখন বেছে বেছে হুলওয়ালা আখ বেছে খেতাম আর সখ করে গরু তাড়াতাম।
নানা বাড়ি গেলেও তাই করতাম৷ রস খাওয়ার জন্য ভালো আখ বেছে পরিস্কার করে ধুয়েমুছে মেশিন ধুয়ে লেবু পাতা দিয়ে রস বের করে খেতাম৷ মা চাচি ফুফু খালাদের এনে খাওয়াতাম। আহা ! কি যে মজা লাগতো।
কত যে রাতেও ভাই মামারা আখ এনে দিত। জোস্ন্যা রাতে উঠানে বসে আখ খেতাম। এমন অনেক স্মৃতি আছে।
এরপর চলতো গুড় বানানো৷ কত রকমের গুড় বানাতো৷ পাটালি ঝোলা, জটা, মটকা ইত্যাদি।
বানাতো মুড়ি দিয়ে মোয়া, খই দিয়ে মুড়কি।

এবার আসি মিষ্টি আলুর কথায়। দুপুরে ভাত খাওয়ার আগে আলু সিদ্ধ করা হতো । আমরা প্লেট ভরে আলু নিয়ে বসতাম। আলু ছুলে খেতাম আর পাটকাঠি দিয়ে আঁকাবাঁকা আলু দিয়ে পাখি পশু বানাতাম৷ তাদের হাত পা বানাতাম পাটকাঠি দিয়ে৷ খাট চৌকিতে সাজিয়ে রাখতাম৷ বসে বসে বেচাকেনাও করতাম৷

মাঝেমাঝে কাচা আলু চিবিয়ে খেতাম৷ স্কুলে যাওয়ার সময় হাতে করে খেতে খেতে যেতাম৷ আমাদের স্কুল ছিল অনেক দূর৷ কয়েক মাইল হেটে যেতে হতো৷ যেতে যেতে ক্ষুধা লেগে যেতো৷ সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সময় এসব খাবার ছাড়া অন্য খাবার ছিল না৷ কিছু বিস্কুট চানাচুর থাকলেও আমাদের টাকা দেওয়া হতো না৷ দিলেও দুই এক টাকা৷ তা দিয়ে টিফিনে ঝালমুড়ি আর আইসক্রিম খেতাম৷

এখন এ-সব কেউ ভাবতেই পারে না৷ এখন নানান খাবারে ভরপুর দুনিয়া।এসব খাবারে ভেজাল আর ভেজাল৷ যা খেয়ে মানুষ দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু আর ফিরে যাওয়া যাবে না সে-সব দিনে।
কিন্তু এসব স্মৃতি হৃদয়পঠে ভেসে উঠে মাঝেমাঝে।

আপনার মন্তব্য