ধর্ষকের বিচার দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ

দেশজুড়ে অব্যাহত ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে পুরো দেশের মানুষ। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গত শনিবার রাত থেকে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল রবিবার সকাল থেকে দিনব্যাপী এই বিক্ষোভ সমাবেশ ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিকসাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ।

নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, নির্যাতন ও ধর্ষণ বন্ধ এবং ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গতকাল বিক্ষোভ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঢাবির নারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায়। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার এবং ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

ধর্ষণবিরোধী মঞ্চের ব্যানারে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে নারী-শিশু নিপীড়ন ও ধর্ষণের প্রতিবাদ এবং ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

রাত ৮টার দিকে একটি মশাল মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্য থেকে ভিসি চত্বর দিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। ধর্ষণবিরোধী মঞ্চের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে দিনের বেলায় ঢাবির অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আয়োজিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সমাবেশে’ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশে সভাপ্রধানের বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, ‘ধর্ষণের শাস্তি পাওয়া অপরাধীও জেল থেকে ছাড়া পাচ্ছে।

তাদের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের সমবেদনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই অনুভূতি ধরে রাখতে পারছে না। তারা নিজেরাই ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠছে, নিপীড়ক হয়ে উঠছে। দুর্বল সরকারের সময় যে যার শক্তি প্রয়োগ করছে।’
লেখক ও অধ্যাপক স্বপন আদনান বলেন, ‘দেশে পরিবারের ভেতর মেয়েদের আশ্রয় ভেঙে যাচ্ছে। (মাগুরায়) আট বছরের শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে পরিবারের ভেতরেই। নারী নির্যাতনের বিষয়টিকে স্বাভাবিক করা হচ্ছে, সাফাই গাওয়া হচ্ছে। উত্ত্যক্তকারী বীরের সংবর্ধনা পাচ্ছে। প্রশাসনকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।’

সমাবেশে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুত্ফা। তিনি বলেন, “৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক কর্মচারী দ্বারা ‘মোরাল পুলিশিং’ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। সে ঘটনায় উগ্র সংগঠন থানায় মব সৃষ্টি করে। সন্ত্রাসী অবস্থা তৈরি করলে থানা তাদের কবজায় চলে যায়। তারা থানার ভেতর আটক ব্যক্তির লাইভ ভিডিও প্রচার করে। থানা থেকে বাদীর ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। বাদীকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। যেভাবে অপরাধীকে বিজয়ীর বেশে ছেড়ে দেওয়া হয়, তা সরকারের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার আরেকটি উদাহরণ। এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।’

সমাবেশে অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি এবং যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের দাবিসহ বেশ কিছু দাবি তুলে ধরে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের আয়োজনে একই ধরনের প্রতিবাদী সমাবেশ করা হয় রাজধানীর বেসরকারী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।