যে ১০ কারণে এনসিপি জামায়াত জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে

যে ১০ কারণে এনসিপি জামায়াত জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) এবং জামায়াত (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী)-এর মধ্যে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। যদিও তাদের আদর্শগত পার্থক্য রয়েছে (এনসিপিকে কেন্দ্র-বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক উদারবাদী হিসেবে এবং জামায়াতকে ইসলামপন্থী ও রক্ষণশীল হিসেবে দেখা হয়), তবুও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জোট গঠনের জন্য কিছু সাধারণ বা কৌশলগত কারণ কাজ করতে পারে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং তাদের কার্যক্রমের ভিত্তিতে যে ১০টি প্রধান কারণে এনসিপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করতে পারে, তার একটি বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:

১. প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঐক্য

• ঐতিহাসিক প্রতিপক্ষতা: উভয় দলই (বিশেষ করে জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে এবং এনসিপি সাম্প্রতিক সময়ে) আওয়ামী লীগ ও তাদের পূর্বের শাসনের ঘোর বিরোধী। এই সাধারণ শত্রুকে পরাজিত করা বা ক্ষমতার বাইরে রাখার কৌশলগত লক্ষ্য তাদের এক প্ল্যাটফর্মে আনতে পারে।

• বিশাল নির্বাচনী শক্তি: জামায়াতে ইসলামীর একটি সুসংগঠিত এবং নিবেদিত ভোটার ভিত্তি রয়েছে। অন্যদিকে এনসিপি, সাম্প্রতিক ছাত্র অভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ উদ্ভূত দল হওয়ায়, নতুন প্রজন্মের এবং পরিবর্তনের পক্ষের বিপুল সংখ্যক ভোটারকে আকর্ষণ করতে পারে। এই দুই ধারার ভোটের সমন্বয় একটি শক্তিশালী নির্বাচনী ব্লক তৈরি করতে সক্ষম।

২. সাংবিধানিক ও নির্বাচনী সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য

• আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) সমর্থন: নির্বাচনী সংস্কার, বিশেষত জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation – PR) প্রবর্তনের বিষয়ে এনসিপি এবং জামায়াত উভয় দলই জোরালো সমর্থন দিয়েছে, যেখানে বিএনপি-এর মতো প্রধান দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ছিল। এই সাধারণ সংস্কার এজেন্ডা তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে সহায়ক হয়েছে।

• ঐকমত্য কমিশনের অবস্থান: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কিছু প্রস্তাবনার বিষয়ে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করলেও, জামায়াত ও এনসিপিকে অনেক ক্ষেত্রে একই অবস্থানে দেখা গেছে।

৩. নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে টিকে থাকার কৌশল

• পুরাতন দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে: বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আধিপত্য ছিল। উভয় দলই পুরোনো এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে নিজেদেরকে তৃতীয় বা নতুন প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। জোট গঠন করে তারা এই উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে।

• ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের সুযোগ: জোটের মাধ্যমে উভয় দলই সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেতে পারে, যা এককভাবে হয়তো সম্ভব হতো না।

৪. জুলাই বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা

• পরিবর্তনের পক্ষের শক্তি: এনসিপি জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র আন্দোলনের মূল দল। জামায়াতও এই বিপ্লবের মাধ্যমে সাবেক সরকারের পতন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিকে সমর্থন করেছে। পরিবর্তনের চেতনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান তাদের মধ্যে একটি প্রাথমিক যোগসূত্র তৈরি করতে পারে।

• তারুণ্যের সমর্থন ও সংগঠিত কাঠামো: এনসিপি’র তারুণ্যের উদ্দীপনা এবং জামায়াতের দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত তৃণমূল কাঠামোর সমন্বয় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পারে।

৫. ইসলামপন্থী ভোটারদের সমর্থন লাভ

• ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রভাব: জামায়াতে ইসলামী তাদের ইসলামপন্থী আদর্শের মাধ্যমে একটি বড় অংশের ধর্মপ্রাণ, রক্ষণশীল ভোটারদের প্রভাবিত করে। যদিও এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, তারা সরকার গঠনে সফল হতে এই বিপুল সংখ্যক ইসলামপন্থী ভোটারদের নীরব বা প্রত্যক্ষ সমর্থন কাজে লাগাতে চাইবে।

• নৈতিক ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা: জামায়াতের পক্ষ থেকে অর্থনীতিতে ‘ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকানোর যে বক্তব্য এসেছে, তা এনসিপি’র সামাজিক ন্যায়বিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের সাথে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

৬. ক্ষমতা ও প্রভাবের ভারসাম্য

• আন্তঃদলীয় সমঝোতা: সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে জোট অপরিহার্য হলে, উভয় দলই নিজেদের কিছু আদর্শগত বা কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে এসে ক্ষমতা ভাগাভাগি ও প্রভাব বিস্তারের একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় আসতে পারে।

৭. বিএনপির সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন

• বিএনপি-জামায়াত দূরত্ব: ঐতিহ্যগতভাবে জামায়াত বিএনপির জোটসঙ্গী হলেও, সাম্প্রতিককালে তাদের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা গেছে। এই দূরত্ব জামায়াতকে বিকল্প জোটসঙ্গী খুঁজতে উৎসাহিত করতে পারে।

• এনসিপি’র জোট ভাবনা: এনসিপি’র একটি অংশ বিএনপির সাথে জোটে যাওয়ার পক্ষপাতি হলেও, সামগ্রিক কৌশলগত কারণে বা বিএনপির অবস্থানের সাথে অমিল হওয়ায়, তারা জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে।

তবে, এটাও মনে রাখা দরকার যে আদর্শগত পার্থক্য এবং সাম্প্রতিককালে তাদের মধ্যে বাগযুদ্ধের মতো কিছু টানাপোড়েনও লক্ষ্য করা গেছে, যা জোট গঠনের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। রাজনৈতিক জোট প্রায়শই আদর্শের চেয়ে কৌশল এবং ক্ষমতার সমীকরণের ভিত্তিতেই গঠিত হয়ে থাকে।

৮. ঐতিহাসিক কারণ : বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন সরকারি দল ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হবার রেকর্ড নেই। এনসিপি অলিখিত সরকারি দল। কদিন আগেও প্রধান উপদেষ্টা নিজে এনসিপির রাজনৈতিক পোস্ট শেয়ার করে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছেন।

৯. আওয়ামী লীগের ভোট : এনসিপির নেতৃত্বে জামায়াত বিএনপির সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় যদি এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোট হয় তাহলে আওয়ামী লীগের যতো মানুষ ভোট দিবেন তার অন্তত ৮০% ভোট এনসিপি ও জামায়াতের পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর অন্যতম কারণ ৫ আগস্টের পর সারাদেশে হাজার হাজার আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়েছে বিএনপির নেতা কর্মীরা। যাদের অনেকেই আবার বলছেন এখনও ১৬ বছরের প্রতিশোধের ১০% ও হয়নি মানে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের উপর আরেক দফা অত্যাচার নির্যাতন নেমে আসবে। সেই ভয় থেকেই আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী সমর্থকরা চাইবে বিএনপি যাতে ক্ষমতায় না আসে!

১০. সেনাবাহিনীর সমর্থন : বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বুঝতে পারবেন এই দুটো দেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কতোখানি৷ ৫  আগস্টের বিপ্লব যখন ব্যর্থ হতে যাচ্ছিলো ঠিক তখন জুলাই বিপ্লবীদের জন্য ঢাল হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।  গোপালগঞ্জের সহিংসতার আগে পরে সার্জিস হাসনাতদের যেভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আগলে রেখেছে তাতে অনেকেই ধারণা করছেন আসছে নির্বাচনেও হাসনাত সার্জিসদের উপর সেনাবাহিনীর সফটকর্নার থাকবে৷ সাথে হেফাজত, চরমনাইয়ের সাথে জোট গড়ে ইসলামিক মাইন্ডেট বিশাল জনসংখ্যার ম্যান্ডেট ও আওয়ামী লীগের ভোট সুইং অবধারিতভাবেই এনসিপি, জামায়াত, হেফাজত, চরমনাই জোটকে ক্ষমতায় বসাবে।