জেলাভিত্তিক নিয়মিত ক্রিকেট-ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন প্রসঙ্গে

বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অধিক হলেও এই জনসংখ্যা সমস্যা নয়, সম্পদ। অধিক জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজন সুষ্টু ব্যবস্থাপনা। প্রবাস ও গার্মেন্টস সেক্টরে মানবসম্পদ ব্যবহারের অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশ। এছাড়াও ব্যবসা, কৃষি কাজ, সরকারী বেসরকারী চাকুরীর মাধ্যমে মানব সম্পদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রবাস ও গার্মেন্টস সেক্টর দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের আরো একটি সম্ভাবনাময় খাত হলো ক্রীড়া। ফুটবল ও অন্যান্য ইভেন্টগুলো বৈশ্বিক ভাবে তেমন সফলতা না পেলেও ক্রিকেট বর্তমানে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হওয়ার পাশাপাশি সফলতার দিক দিয়েও বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি এখন বাংলাদেশ। মানবসম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্রিকেট ও ফুটবলও হতে পারে অন্যতম হাতিয়ার।

এক সময় শুধুমাত্র জাতীয় দল ও ঘরোয়া আয়োজনের মধ্যে ক্রিকেট সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন বিশ্বব্যাপী ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেট লীগ আয়োজন হওয়ায় সেসব লীগে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে ক্রিকেটারদের মাধ্যমে। ফুটবলেও আছে সে সম্ভাবনা। ভিনদেশী বড়লীগগুলোতে বাংলাদেশী ফুটবলারদের চাহিদা না থাকরেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর লীগে এবং বড় বড় দেশগুলোর তৃতীয়-চতুর্থ বিভাগের লীগগুলোতে বাংলাদেশী ফুটবলারদের চাহিদা বাড়ছে। ক্রিকেটের মতো বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্বব্যাপী সমাদৃত না হলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ফুটবলে অন্যতম পরাশক্তি। বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। ক্রিকেট এখন এক নাম্বার স্থান দখল করে রাখলেও ফুটবলের জনপ্রিয়তাও কোন অংশে কম নয়। ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফলগ্যত ও অর্থনৈতিক অবস্থান বেশ সুদৃঢ় হলেও দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা খুব বেশি নয় এবং জেলাভিত্তিক ক্রিকেট-ফুটবলের অবস্থা খুবই নাজুক। বিভাগীয় শহরগুলোর পরিস্থিতিও ততটা ভালো নয়।

ঢাকা, চট্টগ্রাম সিলেটের বাহিরে অন্য বিভাগগুলোতে নিয়মিত আয়োজন করা হয় না তিনফরম্যাটের টুর্নামেন্ট। চট্টগ্রামে প্রিমিয়ার লীগে ওয়ানডে ফরম্যাটে হলেও নেই টি২০ লীগ। অথচ বিপিএল শুরুর আগে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃক পোর্টসিটি ক্রিকেট লীগ (টি-টোয়েন্টি) আয়োজন করা হয়েছিল এবং সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। প্রথম আসরের সফলতার পর ২য় আসর আয়োজন করা হয়েছিল দুবাইয়ে। কিন্তু অদৃশ্য কারনে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ময়মনসিংহ প্রিমিয়ার লীগ, বরগুনা প্রিমিয়ার লীগ, সিরাজগঞ্জ প্রিমিয়ার লীগ আয়োজন করা হলেও এই লীগগুলোর ২য় আসর মাঠে গড়ায়নি। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী স্বপ্ন দেখে ক্রিকেট ও ফুটবলে ক্যারিয়র গড়ার, বিপরীতে নিয়মিত জেলাভিত্তিক ক্রিকেট লীগ না হওয়ায় প্রান্তিক পর্যায় থেকে ক্রিকেটার তোলে আনা সম্ভব হয় না। ক্রিকেট শেখার জন্য বিভাগীয় শহরে এসে থাকা-খাওয়া এবং ক্রিকেটীয় সরঞ্জামাদির চাহিদা মেটানোর মত সামর্থ্য না থাকায় বহু প্রতিভাবান ছেলে-মেয়ের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনাশ হচ্ছে। যেহেতু খেলাধূলায় বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ এবং ক্রিকেটে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ সমাদৃত, সেহেতু ক্রিকেট ও ফুটবলে জনশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ আছে বাংলাদেশের সামনে।

ক্রিকেট ও ফুটবলকে ঘিরে বাংলাদেশের সমর্থকদের উম্মাদনা ব্যাপক। সমর্থকদের আগ্রহের ফলে স্পন্সরদের আগ্রহও আশাবাদী হওয়ার মতো। ক্রীড়াপ্রেমীদের আগ্রহ, সরাসরি সম্প্রচার সুবিধা মিলিয়ে জেলা ভিত্তিক নিয়মিত ক্রিকেট ফুটবল লীগ আয়োজন করা প্রয়োজন। জেলা ভিত্তিক ক্রিকেট ও ফুটবল লীগ নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে ক্রিকেটার তোলে আনার কাজটা বিসিবি, বাফুফে, সর্বোপরি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে করতে হবে। জেলাভিত্তিক নিয়মিত অন্তত টি২০ ফ্রাঞ্চাইজি লীগ আয়োজন করতে পারলে জেলা পর্যায় থেকে অসংখ্য ক্রিকেটার-ফুটবলার উঠে আসবে। জেলার হয়ে খেলেই তারা অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বী হবে। ক্রিকেটে যেহেতু বাংলাদেশ দলের অবস্থান ভালো, সেহেতু জেলাভিত্তিক ক্রিকেটকে শক্তিশালী করে ক্রিকেটার তৈরী করতে পারলে টি২০ বিশেষজ্ঞ ক্রিকেটার পাওয়া সহজ হবে। জেলা পর্যায়ে ভালো খেলে জাতীয় পর্যায়ে আসার সুযোগ পাওয়া বহু ক্রীড়াবিদ দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে লীগগুলোতে পারফর্ম করে ভিনদেশী লীগেও খেলার সুযোগ করে নিতে পারবে। ভারত তাদের মানবসম্পদকে ক্রিকেটের মাধ্যমে কাজে লাগাচ্ছে। ভারতের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর রঞ্জি ট্রফি আয়োজন করে ৩৮টি দল নিয়ে। ৩৮টি দলে ৫৭০ জন ক্রিকেট খেলে। ওয়ানডে ও টি২০ ফরম্যাটের মুস্তাক আলী ট্রফিতেও এই ৩৮টি দল খেলে।

ফরম্যাটভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ক্রিকেটার মিলিয়ে অসংখ্য ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পায়। ভারতের বয়সভিত্তিক দলগুলো থেকেও উঠে আসছে বহু ক্রিকেটার। এছাড়াও ভারতের ৩৪টি অঙ্গরাজ্যে ক্রিকেট আয়োজন করা হয়। তামিল নাড়– প্রিমিয়ার লীগ ও কর্ণাটক প্রিমিয়ার লীগ মানের দিক থেকে আইপিএলের আদলেই আয়োজন করা হয়। সরাসরি সম্প্রচারের কারনে এই লীগগুলো ভারতের বাহিরেও বেশ জনপ্রিয়। ভারত যেভাবে তাদের মানবসম্পদ ক্রিকেট-ফুটবলের মাধ্যমে কাজে লাগাচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের সামনেও এই সুযোগ থাকলেও জাতীয় লীগ, ঢাকা লীগ, বিসিএল, বিপিএল মিলিয়ে খুব বেশি ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পায়না। প্রত্যেকটি লীগ দল বৃদ্ধি করা জরুরী হলেও বিসিবির সুস্পষ্ট কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ক্রিকেট-ফুটবলের মাধ্যমে মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুষ্টু পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তদপর বিসিবি, বাফুফে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

জেলাভিত্তিক নিয়মিত ফুটবল-ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করা সম্ভব হলে মানবসম্পদের একটা অংশকে ক্রিকেট ফুটবলে আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে ক্রীড়াবিদ তৈরী করা এবং দেশে-বিদেশে লীগগুলোতে খেলার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভাবে নিজেরা এবং দেশকে সমৃদ্ধ করা কঠিন কাজ হবে না। খেলাধূলা এখন অন্যতম কর্মসংস্থান এবং ক্রিকেট ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ ক্রীড়াবিদ তৈরীর জন্য জেলাভিত্তিক নিয়মিত ক্রিকেট-ফুটবল লীগ আয়োজনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের নিমিত্তে চেষ্টা করা এখন সময়ের দাবী।