সৃষ্টিশীল কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক মাহবুবুর রহমানের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধের নাম ‘হেরে যাওয়া যেন হারিয়ে যাওয়া না হয়’। জনপ্রিয় বাংলা অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ ট্র্যাকারে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।

হেরে যাওয়া যেন হারিয়ে যাওয়া না হয়
মাহবুবুর রহমান


মা-বাবা সন্তানকে উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে সমাজকে উপহার দেবার প্রথম কারিগর ও সেরা শিক্ষক। মা-বাবার প্রত্যেকটি আচরণই সন্তানের জন্য শিক্ষা। সন্তানের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে মা-বাবার জীবনাচার। মা-বাবা সন্তানের ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যত মানস গঠনে আশির্বাদ ও অভিশাপ দুইরূপেই আবির্ভুত হতে পারেন। উত্তম মা-বাবা সন্তানদের জীবনে বড় নিয়ামত। তাঁরা সন্তানদেরকে জীবনের কোন ক্ষেত্রে হেরে গেলেও হারিয়ে যেতে দেন না। উত্তম মা-বাবা সন্তানদেরকে শিখান জীবনে হার-জিত মুদ্রার এপিট-ওপিটের মতো। জীবনের এদের উপস্থিতি অবিচ্ছেদ্য। বর্তমান সমাজে সন্তানের আত্মহত্যা, হতাশা, বিষন্নতা, মাদকাসক্তি, কুসঙ্গ ও জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া ও হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মা-বাবা সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে মনে করা অসংগত নয়। জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে মা-বাবার কিছু ইতিবাচক ভুমিকা পালন করা উচিত। গুটিকয়েক অত্যাবশ্যক দিক আলোকপাত করা যাক যেদিকে মনোনিবেশ করা আদর্শ মা-বাবার জন্য অপরিহার্য জ্ঞান করা যায়।

দুই।।
আকাশ চিরকাল মেঘে ঢাকা থাকে না। মেঘ আর সূর্যের, আলো আর অন্ধকারের ও হাসি আর কান্নার যুগলযাত্রা চিরদিনের নিত্য ঘটনা। হার ও জিত তার ব্যতিক্রম নয়। সন্তানকে কেবল জিততে হবে এ দীক্ষা না দিয়ে হারকে সহজভাবে মেনে নেবার ও ভবিষ্যতে আরো উদ্যমী হবার শিক্ষা দিন। জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে সন্তান হেরে গেলে বা ব্যর্থ হলে তিরস্কার না করে সন্তানের মনোবল চাঙ্গা রাখতে আশার কথা বলুন। শান্তনা দিয়ে পাশে থাকুন। সন্তানকে বুঝান পৃথিবীর সকল মানুষ কোনো ক্ষেত্রেই একসাথে জয়ী হতে পারে না। কেউ হারে বলেই কেউ জিতে। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে সর্বাপেক্ষা ভালোভাবে যে চেষ্টা করে তাঁর পক্ষে জয়ী হওয়া সহজ হয়। শিখান যে কখনোই হারে নি সে কখনোই জিতার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারে নি। সন্তানেরা মা-বাবার কাছ থেকে এ বার্তা নিক যে ব্যর্থ হওয়া মানেই হেরে যাওয়া নয়, বরং নতুন করে আরো ভালোভাবে সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সূচনা করা। আঁধারের পর আলো আসে বলেই তা এত আকাঙ্খিত ও এত সুন্দর।

তিন।।
জীবন একটি দৌঁড় প্রতিযোগিতার মতো। সন্তানকে সবকিছুতেই ফার্স্ট হতে হবে এ বিষবাক্য থেকে বের করে আনুন। একটি দৌড় প্রতিযোগিতা প্রত্যেক প্রতিযোগীই প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয় না। যদি সবাই ফিনিশিং লাইন অবধি পৌঁছায় তবুও সবাই পদক পায় না। আর এ সত্যটি সবাই জেনেই দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। সবাই পদক পাবে না বলে মনোরথহারা হয়ে সবাই দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে এমন চিন্তা বাস্তব সম্মত নয়। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা ও শেষ পর্যন্ত দৌড়ে ফিনিশিং লাইন পর্যন্ত পৌঁছার মধ্যেই প্রতিযোগিতার আনন্দ ও সৌন্দর্য। জীবনকে দৌড় প্রতিযোগিতার মতো নিতে সন্তানকে শিখাতে হবে যেখানে একসাথে সবাই পদক পাবে না। কিন্তু সবাই কে শেষ পর্যন্ত দৌঁডাতে হবে। এ দৌঁড়ে কোনোভাবেই হেরে যাবার ভয়ে হতাশ হয়ে হারিয়ে যাওয়া যাবে না। মা-বাবাকেই সবার আগে সন্তানকে বলতে হবে হেরে যাওয়া মানে হারিয়ে যাবার সূচনা নয়; বরং সাফল্য অর্জনের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর শুভলগ্ন।

চার।।
আমাদের অনেক মা-বাবাই সন্তানকে সরাসরি আমি তোমাকে ভালোবাসি একথাটি বলতে চরম জড়তা বোধ করেন। ফলে সন্তানেরাও মা-বাবাকে সরাসরি অমি তোমাকে ভালোবাসি মা বা বাবা একথাটি মুখ ফোটে বলতে অস্বস্থি বোধ করে। যদিও পরস্পরের প্রতি অতলান্ত ভালোবাসা রয়েছে। কেউ যদি প্রায়শই শুনে যে তাকে কেউ অনেক ভালোবাসে তাহলে সে ভালোবাসার মানুষটির জন্য নিজে ভালো কিছু করার ও ভালোভাবে বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে পায়; সুন্দর জীবন গড়তে সচেষ্ট হয়। সন্তানের হার জিত সব সময় মা-বাবার ভালোবাসার হাতটি যেন সন্তানের কাঁধের উপরেই থাকে; যেন ক্ষণিকের জন্যও সরে না যায়। সন্তানের প্রতিটি ভালো কাজের প্রশংসা করুন । সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে কার্পণ্য করবেন না। প্রয়োজনে সন্তানকে শাসন করবেন। তবে এর মধ্যেও যেন সন্তানের কাছে এ বার্তাটি স্পষ্ট থাকে যে আজ আপনার তাকে শাসন করতে হলো কারণ আপনি কাকে ভালোবাসেন। ভালোবাসা পেলে সন্তান জীবনযুদ্ধে হোঁচট খেয়ে পরে গেলেও হেয় হারিয়ে ফেলবে না; আপনার ভালোবাসার চোখ থেকে সে যেন সরে না যায় অন্তত এ জন্য হলেও সে বারবার উঠে দাঁড়াবে। সন্তানকে ভালোবাসুন। ভালোবাসা প্রকাশে সচেষ্ট হোন।

পাঁচ।।
সন্তানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মা-বাবার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় হলো সন্তানকে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত করা। আজকাল প্রায়শই শোনা যায় মা-বাবা সর্বস্ব নি:শেষ করে সন্তানকে দেশে-বিদেশে পড়াশোনা করিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করিয়ে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করে নিজেরা সন্তান কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে বৃদ্ধাশ্রম বা হাসপাতালের একাকী বিছানায় অশ্রুপাত করছেন। নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ কখনোই বিবেক বর্জিত কোনো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নির্ভার থাকতে পারেন না। তাঁদের বিবেক তাঁদেরকে হতাশ হতে, মাদকাসক্ত হতে, নোংড়া কাজে জড়ানো হতে এবং আত্মহত্যার মতো জঘণ্য কাজ হতে বিরত রাখে। নিজেদের ও সন্তানের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের কথা ভেবেই সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা প্রদানে সর্বোচ্চ গুরুত্বদান করা মা-বাবার আবশ্য কর্তব্য। যদি পারেন, সন্তান হারিয়ে যাবে না; সন্তানকে আমৃত্যু আপনার পাশেই পাবেন।

ছয়।।
দিনদিন গ্রাম শহরের রূপ নিচ্ছে। মানুষ এখন সর্বত্রই অশেষ কর্মব্যস্ত। নিজের ক্যারিয়ার আর স্পনপূরণে ব্যস্ত মা-বাবা সন্তানকে নিয়ে ভাবার ও সন্তানকে নিবিড়ভাবে সময় দেবার সুযোগ খুব কমই পান। অথচ সন্তানের চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যতের মজবুত ভিত রচনায় সন্তানকে মা-বাবার মানসম্পন্ন সময় দান অপরিহার্য। সন্তানকে মানসম্পন্ন সময় দিলে মা-বাবা যেমন সন্তানকে বুঝতে পারে, তেমনি সন্তানও মা-বাবাকে বুঝতে পারে। পারস্পরিক বন্ধন তথা পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী হয়। পৃথিবীর সবকিছুই ফিরেফিরে আসে। আজ আপনার সন্তানকে আপনি সময় দিন, আপনার সন্তান আপনাকে বার্ধক্যে বাড়িতেই সময় দেবে; বৃদ্ধাশ্রম বা হাসপাতালে ছেড়ে আসবে না। সন্তানকে সময় দিন, জীবনযুদ্ধে টিকে থেকে এগিয়ে যাবার তালিম দিন।

সাত।।
পারস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবার শিক্ষা সন্তানকে শৈশব থেকেই দিন। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ সুন্দর করে চারপাশকে; সুন্দর করে সমাজ জীবনকে। সুন্দর ব্যবহার ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অভ্যাস মানষের রাগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিকূলতা মোকাবিলায় বিশেষ নিয়ামকের ভুমিকা পালন করে।

আট।।
সন্তানকে জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলুন। কর্মমুখী শিক্ষা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। বেকারত্বের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয় তখনই যখন প্রয়োগ নেই, চাহিদা নেই এমন শিক্ষায় সময় ব্যয় হয়ে যায়। শিক্ষার পাশাপাশি সন্তানকে মানসিক ও শারীরিকভাবে শক্ত করে গড়ে তুলুন। সন্তানকে চাকরিই করতে হবে এমন মানসিকতা থেকে বের করে এনে যা আছে তা দিতেই কিভাবে উদ্যোক্তা হওয়া যায় সে দিকে মনোনিবেশ করতে উদ্বোদ্য করুন। সর্বক্ষেত্রে ভালো করতে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করুন সকল কাজে ; প্রথম হতে নয়। সন্তানকে সন্তুষ্ট জীবনযাপনের শিক্ষা দিন। সন্তান তখন হারকে হার মনে করবে না, বরং নতুন করে শুরু করার সুযোগ মনে করবে। সন্তান হতাশায় হারিয়ে যাবে না।

শেষকথন।।
আজকের ডিজিটালাইজেশন ও গ্লোবালাইজেশনের এ কঠিন বিশ্ব বাস্তবতায় আদর্শ ও সোনার টুকরো সন্তান পেতে হলে মা-বাবাকে চোখ বন্ধ করে বসে থাকলে চলবে না। দায়িত্ব পালন না করে দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। সবসময় আমার সন্তানকেই জিততে হবে, আমার সন্তানকে সবক্ষেত্রে প্রথম হতে হবে আর আমার সন্তানকেই সবার সেরা হতে হবে এ ধরণের মানসিকতা থেকে মা-বাবাকে বের হয়ে এসে সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হবার পাঠ দিতে হবে। হার খেলাচ্ছলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার শিক্ষা সন্তানকে মা-বাবাকেই দিতে হবে। মা-বাবাই পারে কোথাও কোনো ক্ষেত্রে হেরে যাওয়া সন্তানকে জীবনযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে। মা-বাবা হোক সন্তানের জীবনে এগিয়ে যাবার ধ্রুব আশার আলোকবর্তিকা।

লেখক: মাহবুবুর রহমান
৩১ তম বিসিএসে কর ক্যাডার এবং ৩৩ তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। বর্তমানে তিনি বিসিএস কর ক্যাডারে উপ-কর কমিশনার পদে কর্মরত আছেন।

আপনার মন্তব্য