কিছু মৃত্যু কেবল মৃত্যু নয়। কিছু মৃত্যু একটি সময়ের মুখোশ খুলে দেয়। কিছু মৃত্যু আমাদের সামনে এমন একটি আয়না ধরে, যেখানে আমরা শুধু মৃত মানুষটিকে দেখি না—দেখি রাষ্ট্রকে, রাজনীতিকে, প্রতিষ্ঠানকে, সমাজকে; এমনকি নিজেদেরও। আবরার ফাহাদের মৃত্যু তেমনই একটি আয়না।
২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হল থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মরদেহ। তার আগের রাতে তাঁকে হলের একটি কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। সে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। একটি পরিবার যার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল।
একটি তরুণ জীবন—যে জীবন হয়তো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা মানবতার জন্য আরও অনেক কিছু দিতে পারত। সেই জীবন থেমে গেল। কেন? এই ‘কেন’-এর উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছিল মামলা।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট সেই সাজা বহাল রাখেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ সাত বছর পেরিয়ে গেছে। রায় হয়েছে। আপিল হয়েছে। হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবুও আইনের সর্বোচ্চ স্তরে প্রক্রিয়াটি এখনো শেষ হয়নি। এখানে আমাদের আবেগ দিয়ে নয়, আইনের চোখ দিয়ে তাকাতে হবে।
কারণ ন্যায়বিচার মানে শুধু কঠোর শাস্তি নয়; ন্যায়বিচার মানে নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার, আপিলের অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও থেকে যায়—একজন তরুণের জীবন চলে যেতে কত সময় লাগে, আর সেই মৃত্যুর বিচার সম্পূর্ণ হতে কত সময় লাগে?
মতের সঙ্গে মতের যুদ্ধ হোক, মানুষের সঙ্গে নয়। আবরার হত্যাকাণ্ডের আলোচনায় তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যের প্রসঙ্গ এসেছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং কিছু সরকারি চুক্তি নিয়ে তাঁর সমালোচনামূলক অবস্থান ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—আবরার কী বলেছিলেন, সেটি নিয়ে কারও সঙ্গে মতভেদ থাকতেই পারে। থাকুক। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে। প্রশ্ন থাকবে সমালোচনা থাকবে। যুক্তি থাকবে। প্রতিযুক্তিও থাকবে।
কিন্তু একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা হলো—মতের জবাব মত দিয়ে দিতে হয়। যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দিতে হয়।আইনের জবাব আইন দিয়েই দিতে হয়। সহিংসতা কোনো মতাদর্শের ভাষা হতে পারে না। ভয় দেখানো কোনো নেতৃত্বের প্রমাণ হতে পারে না। আর কোনো শিক্ষার্থীর ভিন্নমত তার নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কি জ্ঞানের জায়গা, নাকি ক্ষমতার?
এই প্রশ্নটি আবরারের মৃত্যুর পর নতুন করে সামনে এসেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে একজন তরুণ ভুল করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, বিতর্ক করতে পারে, নিজের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে। কারণ শিক্ষা মানেই তো চিন্তার স্বাধীনতা। আজ যে ছাত্র একটি মত পোষণ করছে, আগামীকাল সে হয়তো অন্য মত গ্রহণ করবে। কিন্তু যদি সে প্রশ্ন করার আগেই ভয় পায়?
যদি সে ভিন্নমত প্রকাশ করার আগে চারপাশ দেখে নেয়? যদি তাকে মনে করতে হয়—‘আমার কথা পছন্দ না হলে আমার কী হবে?’ তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন থাকবে, ক্লাস থাকবে, পরীক্ষা থাকবে—কিন্তু শিক্ষার আত্মা থাকবে তো? আবরারের মৃত্যু আমাদের এই প্রশ্নটি করেছিল। সাত বছর পরও প্রশ্নটি মরে যায়নি। শুধু হত্যাকারীর বিচার নয়, ব্যবস্থারও আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন। আমরা সাধারণত কোনো হত্যাকাণ্ডের পর একটি প্রশ্ন করি— খুনি কে? আইনের জন্য এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্য আরও কিছু প্রশ্ন আছে—কেন এমন পরিবেশ তৈরি হলো? কীভাবে একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটতে পারল? প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি কোথায় ছিল? নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? ক্ষমতার সংস্কৃতি কীভাবে শিক্ষাঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছিল? কারণ একজন অপরাধীর বিচার একটি অপরাধের পরিণতি নির্ধারণ করতে পারে।
কিন্তু একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের অপরাধ প্রতিরোধ করতে পারে। একটি হত্যার বিচার অতীতকে স্পর্শ করে। একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎকে রক্ষা করে। এই পার্থক্যটি আমরা যেন ভুলে না যাই। সাত বছর পর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। আবরার ফাহাদের ছবি আমরা প্রতি বছর দেখি। তাঁর নাম উচ্চারণ করি। স্মরণ করি।
শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু একজন শহীদ তরুণকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় কি শুধু তাঁর ছবি প্রকাশ করা?
নাকি এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করা, যেখানে আর কোনো শিক্ষার্থীকে তাঁর মতের জন্য, পরিচয়ের জন্য কিংবা কোনো ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর রোষের কারণে জীবন হারাতে হবে না? আমি দ্বিতীয়টিকেই সত্যিকারের স্মরণ মনে করি। কারণ স্মৃতিসৌধ মানুষকে অতীত মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান মানুষকে ভবিষ্যৎ নিরাপদ করে। আমাদের প্রয়োজন সেই ভবিষ্যৎ।
আবরার কোনো দলের সম্পত্তি নন। এ কথাটিও বলা জরুরি। আবরার ফাহাদকে কোনো দলীয় প্রতীকে বন্দী করা উচিত নয়। তিনি একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। একজন সন্তান ছিলেন। একটি পরিবারের স্বপ্ন ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ হতে পারে। মতাদর্শগত ব্যাখ্যা হতে পারে।
কিন্তু একজন মৃত তরুণকে কোনো রাজনৈতিক সুবিধার উপকরণে পরিণত করা তাঁর স্মৃতির প্রতি সুবিচার নয়।
আবরারের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি একজন মানুষ। আর মানুষের জীবনের মূল্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড়।
আগুন ঝরা সত্য:-
সাত বছর পরও তাই আবরার ফাহাদের নাম আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে তাঁর ছবি। অন্য হাতে প্রশ্ন। আমরা কি বদলেছি? আমাদের শিক্ষাঙ্গন কি আরও নিরাপদ হয়েছে? আমাদের প্রতিষ্ঠান কি আরও জবাবদিহিমূলক হয়েছে? আমরা কি ভিন্নমতকে শত্রু না ভেবে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শিখেছি? আমরা কি বুঝেছি—নেতৃত্ব মানে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, মানুষকে নিরাপদ করা? আমরা কি বুঝেছি—ক্ষমতা মানে ভয় সৃষ্টি করার অধিকার নয়, দায়িত্ব বহনের অঙ্গীকার?
আর আমরা কি বুঝেছি—একটি রাষ্ট্রের শক্তি কতজন মানুষকে চুপ করিয়ে দিতে পারে, তার মধ্যে নয়; বরং কতজন মানুষকে নিরাপদে কথা বলার সুযোগ দিতে পারে, তার মধ্যে। এটাই আগুন ঝরা সত্য। আবরার ফাহাদ ফিরে আসবেন না। তাঁর পরিবার হারানো সন্তানকে ফিরে পাবে না। একটি তরুণ জীবন আর দ্বিতীয়বার শুরু হবে না। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নগুলো জন্ম নিয়েছে, সেগুলোকে আমরা চাইলে উত্তরহীন রাখতে পারি। আবার চাইলে সেখান থেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির শিক্ষা নিতে পারি।
যেখানে—মত থাকবে, কিন্তু মতের জন্য মৃত্যু থাকবে না। রাজনীতি থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা থাকবে না। নেতৃত্ব থাকবে, কিন্তু নেতৃত্বের নামে ভয় থাকবে না। ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার ঔদ্ধত্য থাকবে না। প্রতিষ্ঠান থাকবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি থাকবে না।
সাত বছর পর আবরার ফাহাদের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হবে—আর কোনো আবরারের জন্য যেন আমাদের এমন লেখা লিখতে না হয়। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য কতজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, শুধু তা নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য—কতগুলো সম্ভাব্য অপরাধ ঘটার আগেই রাষ্ট্র তার নাগরিককে রক্ষা করতে পেরেছে। আবরার আমাদের কাছে তাই শুধু অতীত নন। তিনি একটি প্রশ্ন। একটি সতর্কবার্তা। একটি বিবেক।
আর সেই বিবেক আজও আমাদের কানে আগুনের মতো বলে—“ভিন্নমতকে ভয় পেয়ো না। মানুষকে ভয় দেখিয়ো না। ক্ষমতাকে মানুষের ওপরে বসিয়ো না। কারণ যে রাষ্ট্র তার তরুণদের নিরাপদ রাখতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণ।”
সাত বছর পরও তাই আবরার ফাহাদের মৃত্যু শেষ কথা নয়। শেষ কথা হবে—আমরা তাঁর মৃত্যু থেকে কী শিখলাম। আর যদি কিছুই না শিখি—তাহলে সাত বছর নয়, সত্তর বছর পরও এই প্রশ্ন আমাদের তাড়া করবে।
আবরার ফাহাদ—তোমার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার।
মানুষের প্রতি মানবিকতা। এই শপথ নিয়েই শেষ করলাম।