বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হলেও এখানে একটা জিনিস সবসময়ই উল্টো দেখা যায় আর সেটি হলো কে মালিক কে প্রজা! সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারিদের রাষ্ট্রের চাকর আর জনগণকে মালিক দেখানো হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের গ্যারাকলে রাষ্ট্রের মালিক তথা জনগণকে সবসময় প্রজার ভূমিকায় দেখা যেতো। সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক খাজা তারিক এ বিষয়ে তাঁর ভাবনা শেয়ার করেছেন “আমরা আজও প্রজা নাকি জনগণ”?
সংগ্রামী সাথী ও বন্ধুগণ!
বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল একটি জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, যেখানে মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশ, এবং শাসন ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। কিন্তু এই যাত্রায় বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং জনগণের কণ্ঠস্বর দমনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
১৯৭১-১৯৭৫: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুতি
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রের কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা হলেও একদলীয় শাসন (বাকশাল) প্রবর্তন জনগণের অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত করে।
এই সময় সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের সক্রিয় অংশীদার না হয়ে ‘প্রজা’র ভূমিকায় রয়ে যায়।
১৯৭৫-১৯৯০: সামরিক শাসন এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন
জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের সামরিক শাসনের অধীনে জনগণ ‘প্রজা’র মতো শাসন ব্যবস্থার অধীন ছিল।
তবে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন জনগণের শক্তি প্রদর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
১৯৯১-২০২৪: গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং হাসিনা-খালেদা যুগ
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি থাকলেও দুটি পরিবারের রাজনীতিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং দলীয় আধিপত্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ বাধাগ্রস্ত করেছে।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে (২০০৯-২০২৪) ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং বিরোধী দলের উপর দমন-পীড়নের কারণে জনগণ ‘প্রজা’ হিসেবেই রয়ে গেছে।
২০২৪: ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লব এবং রাজনৈতিক পালাবদল
জুলাই বিপ্লবের পটভূমি:
দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে গণআন্দোলন শুরু হয়, যা ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়।
৮ আগস্ট: ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার:
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন।
তবে, ১০০ দিনের এই সময়কালে সরকার জনসাধারণের আস্থা অর্জন করতে কতটা সক্ষম হয়েছে, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
৫ আগস্ট থেকে ১৫ মাসে: এখনও আমরা প্রজা না কি জনগণ?
জুলাই বিপ্লব এবং হাসিনার পতনের ফলে জনগণের শক্তি এবং সচেতনতা স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু ১৫ মাসের এই সময়কালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে:
১. সক্রিয় অংশগ্রহণ:
ড. ইউনুসের সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে, তবে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। তাই ‘জনগণ’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া এখনও অসম্পূর্ণ।
২. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান:
অন্তর্বর্তী সরকার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে তারা আবারও ‘প্রজা’তে পরিণত হতে পারে।
৩. অধিকার বনাম দমন:
আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে জনগণের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যদি তাদের কণ্ঠস্বর শোনা না যায়, তাহলে তারা আবারও ক্ষমতার কাঠামোর শিকার হয়ে যাবে।
আমরা প্রজা না কি জনগণ?
প্রজা:
প্রজা হলো সেই জনগোষ্ঠী, যারা শাসনের অংশীদার নয়, বরং শাসনের অধীন। জুলাই বিপ্লবের আগে আমরা নিঃসন্দেহে ‘প্রজা’ ছিলাম, কারণ সরকার আমাদের কণ্ঠকে দমন করেছিল এবং শাসন ব্যবস্থায় আমাদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
জনগণ:
‘জনগণ’ হলো সেই সজাগ জনগোষ্ঠী, যারা শাসন ব্যবস্থায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
২০২৪ সালের আন্দোলন জনগণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি পদক্ষেপ, কিন্তু এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
ড. ইউনুসের সরকারের ১৫ মাসের কর্মকাণ্ড যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের ক্ষমতায়নের ভিত্তি তৈরি করতে না পারে, তবে জনগণের শক্তি আবারও নিস্তেজ হয়ে যাবে।
পরিশেষে, আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে যে, জনগণের শক্তি কীভাবে পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু প্রজা থেকে জনগণ হয়ে ওঠার যাত্রা এখনও অসম্পূর্ণ।
আমরা ‘জনগণ’ হয়ে উঠবো তখনই, যখন শাসনব্যবস্থায় আমাদের মতামত এবং অংশগ্রহণ কার্যকর হবে।
যদি ১৫ মাসের এই সময়কালে অন্তর্বর্তী সরকার গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের ক্ষমতায়নের স্বপ্ন পূরণ হবে না।
সুতরাং, ২০২৪ সালের আগষ্ট পরবর্তী ১৫ মাসের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ‘প্রজা’ থেকে ‘জনগণ’ হয়ে ওঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক চর্চা এবং জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে।
তাই প্রজা নয়, পূর্ণ অধিকার নিয়েই আমরা জনগণ হয়ে থাকতে চাই।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
খাজা তারিক
মাগুরা ২
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)