আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাযা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র হারালো একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে, আর জাতি হারালো দীর্ঘ চার দশকের এক সংগ্রামী রাজনৈতিক চরিত্রকে। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হবার নয়।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এক অনিবার্য বাস্তবতা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর একটি অস্থির ও বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি রাজনীতির দায়িত্ব কাঁধে নেন। সামরিক শাসন, দলীয় সংকট ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে—যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
১৯৯০–পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বৈরশাসনবিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর উচ্চারিত বক্তব্য—“ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আর আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা”—সে সময়ে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন ও গণতান্ত্রিক প্রত্যয়ের প্রকাশ। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করে—যা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় তাঁর শাসনামল যেমন প্রশংসা ও সমর্থন পেয়েছে, তেমনি সমালোচনার মুখোমুখিও হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মূল্যায়নে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতির এক শক্ত অবস্থান। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক বিরোধ, কারাবরণ ও দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও তিনি আপসের রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন—যা তাঁকে তাঁর সমর্থকদের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক করে তুলেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে—বাংলাদেশের রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি আদর্শ, অবস্থান ও সাংবিধানিক চেতনার সংঘাতও বটে। তিনি এই সংঘাতের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন। তাঁকে নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আজ তিনি নেই। কিন্তু তিনি রয়ে যাবেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে—একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, একজন শক্তিশালী বিরোধী নেত্রী হিসেবে, এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্থায়ী নাম হিসেবে। মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। রাষ্ট্র ও জাতির পক্ষ থেকে তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।