চেতনার মুখোশ, বিভাজনের রাজনীতি এবং ক্ষমতার নিশ্চিন্ত উৎসব

চেতনার মুখোশ, বিভাজনের রাজনীতি এবং ক্ষমতার নিশ্চিন্ত উৎসব। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন যে দৃশ্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো—চেতনার নামে এক ভয়ংকর আত্মঘাতী সংঘর্ষ। একদিকে বিএনপি জোট, অন্যদিকে এনসিপি–জামায়াত জোট। মুখোমুখি অবস্থান, তীব্র ভাষা, চেতনার উচ্চারণ—সবই আছে। নেই শুধু একটি জিনিস: ক্ষমতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ।

এই সংঘর্ষ আদর্শের নয়, এটি দায়িত্বহীন প্রতিযোগিতা। এখানে কে রাষ্ট্র রক্ষা করবে—সেই প্রশ্ন নেই; আছে কে কাকে কোণঠাসা করবে তার হিসাব। আর এই হিসাবের ফলাফল একেবারেই একমুখী—দূর থেকে নিশ্চিন্ত তালি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

রাজনীতির কঠিন সত্য হলো—বিভক্ত বিরোধী মানেই শক্তিশালী শাসন। এখানে শাসকের আর দমননীতি প্রয়োগের দরকার পড়ে না, বিরোধীরাই নিজেদের ক্ষয় করে দেয়। একে অপরকে অগ্রাহ্য করতে গিয়ে তারা শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্নাতীত করে তোলে। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক সমঝোতা—অঘোষিত, কিন্তু কার্যকর।
চেতনার লড়াই যদি সত্যিই থাকত, তবে তার লক্ষ্য হতো কর্তৃত্ববাদ, ভোটহীনতা, বিচারহীনতা ও নাগরিক অধিকার হরণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চেতনার তলোয়ার ঘুরছে বিরোধীর দিকেই। এতে রাষ্ট্রের কোনো লাভ নেই, জনগণের কোনো মুক্তি নেই—লাভ কেবল ক্ষমতার স্থায়িত্বে।

এই রাজনীতিতে জনগণ নেই; আছে কেবল দর্শক। চেতনার নামে উচ্চকণ্ঠ বিতর্ক চলছে, কিন্তু জনগণের জীবনযাত্রা, দ্রব্যমূল্য, নিরাপত্তা কিংবা ভবিষ্যৎ—এসব প্রশ্ন সচেতনভাবে আড়ালে রাখা হচ্ছে। কারণ এসব প্রশ্ন সামনে এলে বিভাজনের রাজনীতি টেকে না।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই সংঘর্ষকে ‘স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এটি স্বাভাবিক নয়; এটি পরিকল্পিতভাবে অনুঘটকের কাজ করছে শাসনের পক্ষে। আজ যারা একে অপরকে রাজনৈতিক শত্রু বানাচ্ছে, তারা আসলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় নিজেদেরই দুর্বল করে তুলছে।
চেতনার লড়াই মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল শাসনের বিরুদ্ধে। কিন্তু যখন সেই লড়াই দাঁড়িয়ে যায় পরস্পরের বিপরীতে, তখন তা আর লড়াই থাকে না—তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া।

শেষ কথা, কোনো কূটনৈতিক বাক্য নয়:
যে রাজনীতি শাসককে অস্বস্তিতে ফেলে না, যে রাজনীতি ক্ষমতার ঘুম ভাঙায় না, যে রাজনীতি জনগণকে কেন্দ্রে আনে না—
সে রাজনীতি চেতনার নয়, সে রাজনীতি শাসনের সহযোগী।
আজ তালি পড়ছে দূর থেকে। কাল সেই তালি গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক হয়ে উঠতে পারে।

মোঃ তারিকুল ইসলাম (খাজা তারিক)

রাজনীতি বিশ্লেষক ও সিনিয়র  যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি মাগুরা জেলা