জেগে উঠেছে ককরোচ: তারুণ্যের কণ্ঠরোধ করে গণতন্ত্র বাঁচানো যায় না!

49

বাংলাদেশ, ভারত ও বিশ্বের নতুন প্রজন্মের প্রতি এক প্রতিবাদী উচ্চারণ —-“আজাদি! হাম রাহেঙ্গে আজাদি!
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!” এই স্লোগান কোনো একটি ভূখণ্ডের নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, স্বাধীন চিন্তা এবং অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার ভাষা—যদিও বিভিন্ন আন্দোলনে এর অর্থ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

আজ বাংলাদেশে, ভারতে এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে নতুন প্রজন্ম একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলছে: রাষ্ট্র কার জন্য? ক্ষমতা কাদের জন্য? আর জনগণের কণ্ঠস্বরের ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকার কে কাকে দিয়েছে?

ভারতের দিল্লিতে ১০ অক্টোবর ২০২৬-এ ককরোচ জনতা পার্টি ও সংশ্লিষ্ট আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক আটক অভিযান হয়েছে। ধ্রুব রাঠি, নেহা বোরা এবং আরও অনেক পরিচিত ও সাধারণ আন্দোলনকারীর আটক হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আটক হওয়ার সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন দাবি রয়েছে; সব সংখ্যাই স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো সরকারের রাজনৈতিক অস্বস্তি দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। নির্ধারিত হতে হবে সংবিধান, আইন, প্রমাণ এবং নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে। কোনো প্রধানমন্ত্রী বেজার হলেন কি না, কোনো রাষ্ট্রপতি অসন্তুষ্ট হলেন কি না, কোনো সরকার সমালোচনায় বিব্রত হলো কি না—সেটি গণতন্ত্রের মাপকাঠি নয়।

গণতন্ত্রের মাপকাঠি হলো, ক্ষমতায় থাকা মানুষটি তাঁর সমালোচকের অধিকার কতটা সম্মান করেন। রাষ্ট্রের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়। সরকারের বিরোধিতা দেশের বিরোধিতা নয়। ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই কোনো তরুণকে দেশবিরোধী তকমা দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

প্রতিবাদকারীরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন; তাঁদেরও শান্তিপূর্ণ থাকা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং সত্যনিষ্ঠ থাকার দায়িত্ব আছে। কিন্তু আইন প্রয়োগের নামে নির্বিচার আটক, ভিন্নমত দমন কিংবা বৈধ প্রতিবাদকে স্তব্ধ করার চেষ্টা হলে তার জবাবদিহি চাইতেই হবে।

বাংলাদেশের তরুণদের উদ্দেশে:

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন রেখে গেছে: আমরা কি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চেয়েছিলাম, নাকি ক্ষমতার চরিত্রের পরিবর্তনও চেয়েছিলাম? যদি আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আবার বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করি, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কোথায়?

যদি আমরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নতুন কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে বসাই, তাহলে গণতন্ত্রের অর্জন কোথায়?
যদি আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই, তবে সেই স্বাধীনতা শুধু নিজের দলের জন্য নয়—প্রতিপক্ষ, সমালোচক, সংখ্যালঘু এবং সাধারণ নাগরিকের জন্যও নিশ্চিত করতে হবে।

গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। কোনো দল, গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রের একক উত্তরাধিকারও নয়। এটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

তারুণ্যের কাজ শুধু রাস্তায় স্লোগান দেওয়া নয়; তারুণ্যের কাজ হলো এমন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আবার একই অধিকারের জন্য জীবন বাজি রেখে লড়তে না হয়।

ভারতের তরুণদের প্রতি:

পরীক্ষায় স্বচ্ছতা চাইলে তা অপরাধ হতে পারে না। ভোটার তালিকার নির্ভুলতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তার উত্তর হওয়া উচিত প্রমাণ, তদন্ত ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে। নির্বাচন কমিশন বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করতে হবে—অভিযোগকে অন্ধভাবে সত্য ধরে নেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি প্রশ্ন তোলার অধিকারকে অস্বীকার করাও অনুচিত।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনী, সীমান্ত, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিতে নয়; তার শক্তি এই নিশ্চয়তায়ও যে, একজন সাধারণ নাগরিক ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করতে পারবেন এবং আইনের সুরক্ষা পাবেন।

কাঁটাতারের বেড়া দেশের সীমানা রক্ষা করতে পারে; মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে চিরকাল বন্দী রাখতে পারে না।

প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা একটি সমাবেশ থামাতে পারে। কাউকে আটক করে সাময়িকভাবে তার চলাচল সীমিত করা যায়। কিন্তু মানুষের ন্যায়বিচারের দাবি, যুক্তির শক্তি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কেবল বলপ্রয়োগ দিয়ে সমাধান করা যায় না।

বিশ্বের নতুন প্রজন্মের প্রতি:তোমরা কোনো নেতার অন্ধ অনুসারী হয়ো না। কোনো দলের অন্ধ সমর্থক হয়ো না। কোনো রাষ্ট্রের প্রচারকেও প্রশ্নাতীত সত্য বলে গ্রহণ কোরো না।

তথ্য যাচাই করো। অন্যায়ের প্রমাণ সংগ্রহ করো। শান্তিপূর্ণভাবে সংগঠিত হও। আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াও। ভিন্নমতের মানুষের অধিকারকেও নিজের অধিকারের সমান মর্যাদা দাও।

মনে রেখো, গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতারও সীমা থাকে, সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং সরকারকে জনগণের কাছে জবাব দিতে হয়।

কোনো সরকার চিরস্থায়ী নয়। কোনো ক্ষমতাই জনগণের ঊর্ধ্বে নয়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দিতে পারে না।

আমরা এমন স্বাধীনতা চাই না, যেখানে শুধু আমাদের পক্ষের মানুষ কথা বলতে পারবে। আমরা এমন স্বাধীনতা চাই, যেখানে আমাদের বিরোধীরাও নিরাপদে কথা বলতে পারবেন। আমরা এমন বিপ্লব চাই না, যা শুধু ক্ষমতার আসন বদলায়। আমরা এমন গণতান্ত্রিক রূপান্তর চাই, যা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকায়।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে তরুণদের যোগ্যতা পরিচয়ের কাছে পরাজিত হবে না; এমন ভারত চাই, যেখানে নাগরিকের অধিকার রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভর করবে না; এমন বিশ্ব চাই, যেখানে রাষ্ট্রের শক্তির পাশাপাশি মানুষের মর্যাদাও সমান গুরুত্ব পাবে।

আমার শেষ কথা:

রাষ্ট্র জনগণের মালিক নয়; রাষ্ট্র জনগণের সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত। সরকার রাষ্ট্রের সমার্থক নয়, আর সরকারকে প্রশ্ন করা দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়।

যে তরুণ আজ ন্যায়বিচার চাইছে, তাকে শত্রু নয়—নাগরিক হিসেবে দেখতে শিখুন। যে নাগরিক প্রশ্ন করছে, তাকে স্তব্ধ করার আগে তার প্রশ্নের উত্তর দিন। যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তার অভিযোগকে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করুন। ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার বাস্তব রেকর্ডই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।

তাই আজ আমাদের উচ্চারণ—

আজাদি মানে শুধু পতাকার স্বাধীনতা নয়; আজাদি মানে মানুষের মর্যাদা।
ইনকিলাব মানে শুধু পুরোনো ক্ষমতার পতন নয়; ইনকিলাব মানে এমন ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যেখানে নতুন ক্ষমতাও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের তরুণ, ভারতের তরুণ এবং বিশ্বের সব স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতি আহ্বান:

নিজের অধিকার জানো। অন্যের অধিকার রক্ষা করো। সত্য যাচাই করো। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করো। জবাবদিহি দাবি করো। গণতন্ত্রকে কোনো দলের সম্পত্তি হতে দিয়ো না। তারুণ্য কোনো অপরাধ নয়। প্রশ্ন কোনো অপরাধ নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কোনো অপরাধ নয়।

মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার পক্ষে কণ্ঠস্বর উঠুক—বাংলাদেশে, ভারতে এবং পৃথিবীর সর্বত্র।

আজাদি!
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক।
মানুষের অধিকার অটুট থাকুক।